সাক্ষাৎকার
‘কিউআর কোড’কে ‘বাংলা কিউআর’বান্ধব করতে কাজ করছি

মো. মাহীয়ুল ইসলাম, ডিএমডি, ব্র্যাক ব্যাংক
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলো কী কী?
‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে পেমেন্ট গ্রহণ করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। এ প্রক্রিয়ায় পেমেন্ট গ্রহণ করলে তারা জাল নোট কিংবা ছেঁড়া-ফাটা নোটের কারণে যে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন, সেই আশঙ্কা থাকবে না। অনেক সময় খুচরা টাকা না থাকার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে ছাড় দিতে হয়। ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে পেমেন্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এ সমস্যার সমাধান করেছে। একই সঙ্গে, নিজেদের কাছে সার্বক্ষণিক ক্যাশ টাকা রাখার ও ক্যাশ বহন করার ঝুঁকিও থাকবে না।
পাশাপাশি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রথাগত ব্যাংক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণসুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন। কারণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে প্রায় শতভাগ লেনদেন নগদে হওয়ার কারণে ব্যাংকের পক্ষে তাদের প্রকৃত আয় বা ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাদের ঋণ দেওয়াও ব্যাংকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে পেমেন্ট নেওয়া হলে, ব্যাংকের সিস্টেমে তাদের একটি নির্ভরযোগ্য লেনদেনের রেকর্ড থাকবে, যা পর্যালোচনা করে ব্যাংক খুব সহজেই তাদের ঋণসহায়তা দিতে পারবে।
বাংলা কিউআরের মাধ্যমে এসএমই উদ্যোক্তা এবং সাধারণ গ্রাহকদের ডিজিটাল লেনদেনে আরও সম্পৃক্ত করতে আপনারা কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন?
ব্র্যাক ব্যাংক সবসময় ডিজিটাল লেনদেনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এসএমই উদ্যোক্তা এবং সাধারণ গ্রাহকদের উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করে। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন বৃদ্ধি করার অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো একটি শক্তিশালী ইন্টার-অপারেবল অ্যাপ থাকা, যা ব্যবসায়ী ও গ্রাহকদের সহজে এবং স্বল্পসময়ে লেনদেনের সুবিধা দিতে পারে। সে লক্ষ্যে ব্র্যাক ব্যাংক ‘আস্থা’ অ্যাপ চালু করেছিল এবং প্রতিনিয়ত এর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে ‘আস্থা’ অ্যাপ ব্যবহার করে প্রতি মাসে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। অনেক আগে থেকেই ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে ‘কিউআর কোড’ পেমেন্ট চালু করেছিলাম। বর্তমানে আমরা অ্যাপটিকে আরও ‘বাংলা কিউআর’বান্ধব করে গড়ে তুলতে কাজ করছি।
এরই মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি ‘বিকাশ’ একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মার্চেন্টদের সবচেয়ে বড় ‘বাংলা কিউআর’ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। একই সঙ্গে, ব্র্যাক ব্যাংকের নির্ধারিত ‘বাংলা কিউআর’ আমরা দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছি। আমরা রিটেইল, এসএমই ও করপোরেট— এই তিন বিভাগকে ‘বাংলা কিউআর’ সম্প্রসারণ কাজে যুক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছি। এরই মধ্যে, নতুন এসএমই গ্রাহকদের ব্র্যাক ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ‘বাংলা কিউআর’ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি, শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও আমরা যুক্ত হয়েছি। এর ফলে, এখন থেকে ওই কোম্পানি থেকে ওষুধ কেনা ফার্মেসিগুলোকে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে পেমেন্ট করতে হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি আমরা সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদেরও নানা ধরনের আকর্ষণীয় সুবিধা ও প্রণোদনা দিচ্ছি।
গ্রাহকের পেমেন্ট ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফারের সুবিধা যুক্ত করেছি
মো. মাহীয়ুল ইসলাম
উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ব্র্যাক ব্যাংক
বাংলা কিউআরের মূল উদ্দেশ্য কী এবং এর মাধ্যমে ক্যাশনির্ভরতা কতখানি কমবে?
‘বাংলা কিউআর’ প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস, নিরাপদ এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। ২০২৭ সালের মধ্যে মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস করার যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তার বড় একটি অংশ পূরণ হবে এই ‘বাংলা কিউআর’-এর মাধ্যমে। এটি এরই মধ্যে ক্ষুদ্র মুদিদোকানি থেকে শুরু করে বড় চেইন শপ বা করপোরেট হাউজ— সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। ফলে গ্রাহকরা এখন যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ‘বাংলা কিউআর’ কোড স্ক্যান করে সহজে পেমেন্ট করতে পারছেন। এখানে আগের মতো নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
বাংলা কিউআর ব্যবহারের ফলে ক্যাশের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে। বিশেষ করে, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, যারা আগে ছোট অঙ্কের পেমেন্ট হওয়ার কারণে কিংবা অতিরিক্ত খরচের ভয়ে কার্ডে পেমেন্ট নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না, তারা এখন কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারছেন। ফলে সব ধরনের লেনদেনে কাগজের নোটের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। ‘বাংলা কিউআর’ যত দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে, দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতির রূপান্তর তত দ্রুত হবে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে? এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্র্যাক ব্যাংক কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘বাংলা কিউআর’ জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো, খুচরা ব্যবসায়ীদের এই ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে অভ্যস্ত করা। এখনো অনেক খুচরা ব্যবসায়ীর কোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে সবার আগে এই ব্যবসায়ীদের প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলে নিয়ে আসতে হবে এবং ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি তাদের উৎসাহিত করতে হবে।
সাধারণত খুচরা ব্যবসায়ীদের এ ধরনের ডিজিটাল লেনদেনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিতে হয়। অনেকে এই খরচ এড়াতে এখনো নগদে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ সমস্যা নিরসনে সরকারকে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়ার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে; পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও কিছুটা দায়িত্ব নিতে হবে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই ব্র্যাক ব্যাংকের ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে পেমেন্ট গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমরা ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছি। ব্র্যাক ব্যাংকের ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করা গ্রাহকের পেমেন্ট তাৎক্ষণিক ব্যবসায়ীদের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করার সুবিধাও যুক্ত করেছি আমরা।
পাশাপাশি ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের ‘বাংলা কিউআর’ পেমেন্টের বিপরীতে রিওয়ার্ড পয়েন্ট দিচ্ছি। এসব পয়েন্ট ব্যবহার করে তারা কার্ডের বার্ষিক ফি মওকুফসহ নানা সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের পাশাপাশি ব্র্যাক ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও আস্থা অ্যাপ ব্যবহার করে ‘বাংলা কিউআর’ পেমেন্ট করার সুবিধা চালু করেছি। এ ছাড়া সারা দেশে আমাদের ব্রাঞ্চ, সাব-ব্রাঞ্চ, এসএমই ইউনিট অফিস এবং এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে কর্মরত ১০ হাজারের বেশি সহকর্মীরা ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে লেনদেনে জনগণকে উৎসাহিত করে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে, স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ানো এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্য নিশ্চিত করাটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের সব খুচরা ব্যবসায়ী এখনো স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না। ফলে তাদের হাতে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেসব এলাকায় ইন্টারনেট এখনো সহজলভ্য নয়, সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
‘বাংলা কিউআর’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
গ্রাহকদের এখন দোকানে গিয়ে কেনাকাটার পর নিজের নির্দিষ্ট ব্যাংকের কিউআর কোড খোঁজার কোনো প্রয়োজন নেই। ‘বাংলা কিউআর’ একটি সম্পূর্ণ সর্বজনীন ব্যবস্থা। ফলে আপনার ফোনে ব্র্যাক ব্যাংক বা যেকোনো ব্যাংক কিংবা এমএফএস অ্যাপ থাকলেই, মাত্র একটি ‘বাংলা কিউআর’ কোড স্ক্যান করে মুহূর্তেই পেমেন্ট করা সম্ভব। তবে সুরক্ষার স্বার্থে, কিউআর স্ক্যান করার পর পিন বা ওটিপি দেওয়ার আগে স্ক্রিনে প্রদর্শিত মার্চেন্টের নাম এবং টাকার পরিমাণটি অবশ্যই ভালো করে মিলিয়ে নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নিজের পিন বা পাসওয়ার্ড অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।
মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেটে সুরক্ষিত থাকে। এটি যেমন গ্রাহকের প্রতি মাসের খরচের হিসাব রাখতে সাহায্য করবে, ঠিক তেমনি নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেনের এই নির্ভরযোগ্য রেকর্ড ভবিষ্যতে ব্যাংক থেকে সহজেই ঋণ পেতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বাংলা কিউআর চালুর ফলে ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনে আপনার ব্যাংক কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রত্যাশা করছে?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকনির্দেশনায় দেশব্যাপী ‘বাংলা কিউআর’ পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হলে ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। বর্তমানে সব দোকানপাট বা শপিং মলে কিউআর কোড ব্যবহারের সুবিধা নেই। ফলে গ্রাহকরা চাইলেও অনেক সময় ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারছেন না। তবে সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা প্রসারের ফলে এখন গ্রাহক ও ব্যবসায়ী— উভয়পক্ষই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্যাশলেস লেনদেনে অংশ নিতে পারবেন। এর মাধ্যমে আমরা ক্যাশলেস অর্থনীতি বিনির্মাণের একটি বড় ধাপ অতিক্রম করতে পারব।
‘বাংলা কিউআর’ চালুর কারণে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয়ও ধাপে ধাপে কমে আসবে। ফলে ব্যাংকগুলোর পক্ষে গ্রাহকদের অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে আরও উন্নতমানের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে, ডিজিটাল চ্যানেলে লেনদেন বৃদ্ধির ফলে প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা অলস টাকার পরিমাণও কমে আসবে; যা সামগ্রিক অর্থনীতির গতিশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি করবে।




