পর্যটন খাত পিছিয়ে থাকলেও সমন্বিত মহাপরিকল্পনায় নতুন আশা

ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঠামোগত দুর্বলতায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে এখনো অনেক দূরে দেশের পর্যটন খাত। বর্তমানে অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান মাত্র ৩ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। তবে দীর্ঘদিনের এ স্থবিরতার মধ্যেও নতুন বাজার সম্প্রসারণ ও সরকারের সমন্বিত মহাপরিকল্পনা খাতটিতে নতুন আশা জোগাচ্ছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে করে দেখা যায়, দেশে-বিদেশি পর্যটক আসার সংখ্যা কমেছে ধারাবাহিকভাবে। ২০২৩ সালে যেখানে দেশে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ জন বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪ জনে। সর্বশেষে ২০২৫ সালে এ সংখ্যা আরও কমে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জনে নেমেছে। পর্যটক সংখ্যায় এই বড় পতনের মূল কারণ প্রধান উৎস দেশ ভারত থেকে পর্যটক কমে যাওয়া। ২০২৩ সালে বিদেশি পর্যটকের ৪৫ শতাংশ ভারতীয় থাকলেও ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশে। সংখ্যাগত হিসাবে ২০২৪ সালে ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৮৫ জন ভারতীয় এলেও ২০২৫ সালে তা ২৬ দশমিক ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬০৯ জনে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দুই দেশের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন এবং উভয় দেশের ভিসাপ্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি ও ভিসা দেওয়ার হার কমে যাওয়াই এই আকস্মিক ধসের প্রধান কারণ।
শুধু ভারতনির্ভরতাই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও কাঠামোগত প্রচারণার ঘাটতিও দীর্ঘদিনের। ১৯৯৯ সালে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বাজেটে বরাদ্দ এখনো অপ্রতুল। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, বিশ্বমানের সেবার অভাব এবং অপ্রতুল নিরাপত্তার কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সতর্কতা প্রায়ই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যায়, যা বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। এ ছাড়া পরিসংখ্যান ও মূল অর্থনৈতিক অবদানের মধ্যেও রয়েছে বড় ফারাক।
ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটরদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সরকারি পরিসংখ্যানে উল্লিখিত বিদেশিদের প্রায় ৮৫ শতাংশই মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি, যারা আত্মীয়স্বজনের কাছে থাকেন এবং বাণিজ্যিক পর্যটন খাতে বিশেষ ব্যয় করেন না। প্রকৃতপক্ষে হোটেল, স্থানীয় পরিবহন ও সেবা খাতে অর্থ খরচ করা ‘অবকাশযাপনকারী’ পর্যটকের সংখ্যা মোট আগমনের ১৫ শতাংশের বেশি নয়।
তবে ভারতীয় বাজারে ধস নামলেও এবারের পর্যটন দিবসে আশার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিমা ও পূর্ব এশিয়ার বাজারগুলোর ইতিবাচক সাড়া। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে পর্যটক আগমন ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৮৮ জন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৮ হাজার ১৮২ জনে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ার বাজারে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে চীনে, যেখানে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে পর্যটক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮০৮ জনে। এ ছাড়া ইতালি থেকেও ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ২১ হাজার ৯৫২ জন পর্যটক এসেছেন। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে, সঠিক মনোযোগ দিলে বাংলাদেশ শুধু একটি আঞ্চলিক গন্তব্য না হয়ে আন্তর্জাতিক মানের ভ্রমণকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়াতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবা খাত থেকে রপ্তানি আয়ের চিত্রও বেশ প্রতিশ্রুতিশীল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে পর্যটন খাত থেকে রপ্তানি আয় ১ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা থাকলেও ২০২১-২২ অর্থবছরে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকায়। এই গতি বজায় রাখতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা জোরদার করতে সরকার দেশে থাকা ১ হাজার ৭৪২টি সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার স্পটকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘পর্যটন মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান বর্তমান ৪ থেকে বাড়িয়ে ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করা।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানিয়েছেন, পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা ও সেবার মান বাড়াতে একাধিক অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্রায় ১৫০০ দর্শনীয় স্থান নিয়ে কাজ চলছে। সেখানে পর্যটকদের যাতায়াত, থাকা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার একটি মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ পর্যটকদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যস্থল হয়ে উঠবে। তিনি জোর দিয়ে বললেন, আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজার ধরতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি জোরদার ও অংশীদারদের যুক্ত করে বিশেষ প্রচার অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বলেছেন, দেশের পর্যটনে বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ এখন আশানুরূপ নয়। অনলাইন বা ইলেকট্রনিক ভিসা সুবিধা দেওয়া গেলে বিদেশি পর্যটকদের আরও বেশি আকৃষ্ট করা যেত। সে সঙ্গে দেশের পর্যটন স্থানগুলোর সঠিক প্রচারণার অভাব রয়েছে। বিদেশে সুন্দরবন, কক্সবাজারসহ দেশের বিশেষ পর্যটন এলাকা, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং ধর্মীয় তীর্থস্থানগুলোর প্রচারণা বাড়ানো গেলে ভ্রমণপিপাসুদের আগমন বাড়বে।
টোয়াবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিগত কয়েক বছর নানা ধরনের অস্থিরতা থাকায় দেশে পর্যটক আসার পরিমাণ কমছে। করোনার আগে বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় বাংলাদেশ থেকে আমরা অংশগ্রহণ করতাম। কিন্তু এরপর সেই মেলা আর হয় না। এই মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে পরামর্শ করে আয়োজন করা যেতে পারে। পর্যটন খাত নিয়ে কোনো ধরনের গবেষণা নেই। কোন দেশের পর্যটক আমাদের দেশে বেশি আসে, তার সঠিক তথ্য নেই। ফলে এই খাত উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।’



