সংকট মোকাবিলায় এসএমই ও কৃষিতে গুরুত্ব দিতে হবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হলে আমাদের শুধু বর্তমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করলেই হবে না; বরং অর্থনীতির ভিত্তিকে নতুন করে শক্তিশালী করার দিকেও নজর দিতে হবে। দেশের উন্নয়নের গল্প টেকসই করতে হলে শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, রপ্তানি খাত— সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। শুধু একটি খাতের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রথম যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো দেশের শিল্পায়নের ভিত্তি বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেইজের দুর্বলতা। আমাদের দেশে শিল্প বলতে সাধারণত বড় বড় কারখানা ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকেই বোঝানো হয়। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শিল্পের সংজ্ঞার মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত। বাস্তবতা হলো, ১০০ কোটি টাকা একটি বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ করলে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে সর্বোচ্চ ১০০ জনের কর্মসংস্থান হয়। অথচ একই পরিমাণ অর্থ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) বিনিয়োগ করা হলে জনপ্রতি বরাদ্দ কম হলেও অন্তত দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশে এই অবদান মাত্র ২৫ শতাংশ। তাই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে এসএমই খাতকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
শিল্পের পাশাপাশি কৃষির আধুনিকায়নেও সমান মনোযোগ দেওয়া জরুরি। শুধু সার ব্যবহার করলেই উৎপাদন বাড়বে না; কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করতে হবে। একই সঙ্গে মৎস্য ও পশুপালন খাতের উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে। যদিও কৃষির অবদান এখনো তুলনামূলকভাবে কম, তবে মৎস্য ও পশুপালন খাত মোটামুটি ভালো করছে। মূলত এসব খাতের কারণেই দেশে খাদ্যে কিছুটা স্বয়ংসম্পূর্ণতা ফিরে আসছে। তাই এসব খাতের উদ্যোক্তা ও উৎপাদকদের আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার সম্প্রসারণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি অনেকটাই তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু একটি মাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। তৈরি পোশাকশিল্প নানা ধরনের সুবিধা পাচ্ছে— নগদ প্রণোদনা, স্বল্প সুদে ঋণ এবং অন্যান্য নীতিগত সহায়তা। ফলে অর্থনীতির অন্য সম্ভাবনাময় খাতগুলো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে অর্থনীতিকে ডাইভারসিফাই বা বহুমুখীকরণ করতে হবে, যাতে একাধিক খাত সমানভাবে বিকশিত হতে পারে এবং অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হয়।
সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণের একটি ভিশন আমাদের থাকলেও গত ১৫ থেকে ২০ বছরে দেশের অধিকাংশ অর্থ বৃহৎ শিল্প ও বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অনীহা দীর্ঘদিনের সমস্যা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন ও সরাসরি তহবিলের যে ব্যবস্থা করেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এই তহবিল বিতরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পুরনো ঋণখেলাপিদের কোনোভাবেই এই সুবিধা দেওয়া উচিত নয়। বরং যথাযথ যাচাই-বাছাই করে নতুন, উদ্যমী ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের কাছে এই ঋণ পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তারা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
সবশেষে দেশের রপ্তানি খাতকে দ্রুত বহুমুখী করা এখন সময়ের দাবি। তৈরি পোশাক খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য সম্ভাবনাময় শিল্প ও উৎপাদন খাতকেও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। নতুন নতুন পণ্য ও খাতকে রপ্তানিমুখী করে তুলতে পারলে দেশের বৈদেশিক আয়ের উৎস বাড়বে, অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈশ্বিক বাজারের যেকোনো ধাক্কা মোকাবিলা করাও সহজ হবে। এভাবেই শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং বহুমুখী রপ্তানি খাতের সমন্বিত বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে পারবে।




