সিইপিএ নেগোসিয়েশন সম্প্রসারণের যৌথ ঘোষণা
শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের দুয়ার খুলল কোরিয়ায়
- ৮৪২৮ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা মিলবে
- দেশের বাজারে দ. কোরিয়া সুবিধা পাবে ১০৫৪টি পণ্যে
- দুই দেশের বাণিজ্য ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

সচিবালয়ে গতকাল সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হানকু - পিআইডি
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ-পরবর্তী বৈশ্বিক বাণিজ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, গতি হারানো রপ্তানি সচল করা এবং বাণিজ্য ঝুড়ি বহুমুখীকরণে বড় কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
এক বছরের নিবিড় দরকষাকষি শেষে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (সিইপিএ) নেগোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করেছে সরকার। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকে কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, জুতা ও পাটজাত পণ্যসহ ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের বাজারে ১ হাজার ৫৪টি পণ্যে একই ধরনের সুবিধা ভোগ করবে।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সচিবালয়ে সই হয়েছে। পরে এ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তখন তিনি চুক্তির আওতায় শুল্কসুবিধার কথা জানালেন। উভয় দেশের মন্ত্রিসভা ও প্রাতিষ্ঠানিক আইনি অনুমোদনপ্রক্রিয়া শেষ হলেই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। এ সময় দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হানকু, বাংলাদেশের বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তিটি এমন একসময়ে সম্পাদিত হলো, যখন দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি নিম্নমুখী। ইপিবির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৯ শতাংশ কমে ৪২ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। ফলে এই সিইপিএ চুক্তিটি শুধু চলমান প্রবৃদ্ধির ওপর বাড়তি সুবিধা হিসেবে নয়, বরং মন্দা কাটিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আবার ইতিবাচক ধারায় ফেরানোর এক সুচিন্তিত পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের আকার ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার হলেও বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৪১১ মিলিয়ন ডলার। মূলত শিল্পযন্ত্র, লোহা, ইস্পাত, ইলেকট্রনিকস ও রাসায়নিক পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরতার কারণে কোরিয়ার পাল্লাই ভারী। তবে সিইপিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা কোরীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, যেখানে কোরিয়া পাবে ৮৭ শতাংশ সুবিধা। এটি বিদ্যমান বাণিজ্যবৈষম্য কমিয়ে আনার পাশাপাশি দেশের সার্বিক বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের মোট ৪২১.০৬ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুড়িতে সবচেয়ে বড় অবদান তৈরি পোশাক খাতের, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে ওভেন পোশাক ১৯৯.৯৫ মিলিয়ন ডলার ও নিটওয়্যার ১৬৭.১৩ মিলিয়ন ডলার। পোশাক খাতের পাশাপাশি তামাকজাত পণ্য ১২.৪৪ মিলিয়ন, পাদুকা ১২.২৪ মিলিয়ন, পেপার ইয়ার্ন ও ফাইবার ৫.৭১ মিলিয়ন এবং চামড়াজাত পণ্য ৪.৬৩ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া বার্ষিক প্রায় ১২.৯৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে। বিশাল এই বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা থাকলেও কোরিয়ার প্রিমিয়াম ফ্যাশন চাহিদার সঙ্গে বেসিক পণ্যের অমিল, চীন ও ভিয়েতনামের তীব্র আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং সমন্বিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির অনুপস্থিতির কারণে এতদিন রপ্তানি পিছিয়ে ছিল। স্বাক্ষরিত সিইপিএ চুক্তি বিদ্যমান এই বাণিজ্য বাধা ও অতিরিক্ত শুল্ক বাধা সরাসরি দূর করবে।
পণ্য বাণিজ্যের বাইরে বিনিয়োগ ও সেবা খাতেও বড় অর্জনের পথ খুলেছে। বাংলাদেশ কোরিয়ার জন্য ৯৫টি উপখাত উন্মুক্ত করার বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া ১১১টি সেবা উপখাতে বাংলাদেশকে বাণিজ্য সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে কোরীয় মূলধন ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের শিল্প খাতে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো, যা ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে।
২০২৫ সালের আগস্টে সিউলে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠক থেকে শুরু করে এক বছরের এই আলোচনা প্রক্রিয়ায় মোট পাঁচ দফা সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। টেকনিক্যাল জটিলতা ও অসামঞ্জস্য দূর করতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের দল প্রায় ৪০টি অনলাইন বৈঠকে অংশ নেয়।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী বললেন, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশের সঙ্গে এই বাণিজ্যিক বোঝাপড়া বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
তিনি জানান, ‘দ্রুততম সময়ে বিশ্বের একটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছি। বর্তমান সরকার ক্ষমতার আসার পাঁচ মাসের মাথায় প্রথম সিইপিএ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া দুই ট্রিলিয়ন অর্থনীতির একটি দেশ। আমরা একটি বড় দেশকে বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে পাচ্ছি।’
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘২০৩৪ সালে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিয়ে যাব। সে জন্য ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দরকার। আর দরকার বিদেশি বিনিয়োগ। আমরা এসব চুক্তির মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইছি।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান কু ইয়েও দুই দেশের দীর্ঘ বাণিজ্যিক পটভূমি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বললেন, কোরিয়া ও বাংলাদেশের একটি দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ৫৬ বছর আগে বস্ত্র খাতের ব্যবসা দিয়ে এটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ব এখন পণ্য বহুমুখীকরণে যাচ্ছে, আমাদের দুই দেশকেও পণ্য বহুমুখীকরণের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ‘আমরা আশা করি, বাংলাদেশের নতুন সরকার দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। সেখানে আমরা প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে চাই। এখন কোরিয়ার কোম্পানি সুবিধাজনকভাবে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে।’






