গরুর হালেই চলে আকবার আলীর সংসার

ছবি: আগামীর সময়
ভোরের আলো ফুটতেই লাঙল আর জোয়াল কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সঙ্গে থাকে হালের ১ জোড়া গরু। জমিতে লাঙল চালিয়ে ফসল ফলানোর কর্মযজ্ঞ শুরু হয় তার হাত ধরেই। এভাবেই কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ ৩৫ বছর। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও ছাড়তে পারেননি বাপ-দাদার পেশা। বলছিলাম রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের তেঁতুলতলা এলাকার আকবার আলীর কথা।
৬৫ বছর বয়সী আকবার আলীর সংসার চলে গরুর হাল চাষের আয়েই। একসময় গ্রামের মাঠে মাঠে গরুর হাল চাষের দৃশ্য ছিল পরিচিত। কৃষকের জমি চাষের প্রধান ভরসাই ছিল লাঙল আর জোয়াল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। আধুনিক কৃষিযন্ত্রের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতি। তবুও জীবিকার তাগিদে সেই পুরনো পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন আকবার আলী।
আজ রবিবার দুপুরে দেখা যায়, জমিতে হাল চাষ শেষে গরু ও জোয়াল নিয়ে বাড়ির পথে ফিরছেন আকবার আলী। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে গরু দুটিকে সামনে রেখে জোয়াল কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। আর বলছিলেন, হ-হ-হ ডাইন ডাইন বাম বাম হ-হ। তার এই পথচলা যেন গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা কৃষিজীবনের এক চেনা ছবি।
কথা হয় আকবার আলীর সঙ্গে। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর বর্তমান সময়ের বাস্তবতা তুলে ধরে আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, ‘কি আর করং বাহে, দেহা আর চলে না। কোনো মতে হাল চাষ করি সংসার চালাং। এলা তো সৌউগ নয়া নয়া মেশিন হইছে। তায় কি আর হাল চলে। আগোত কামে উকাস পাং নাই। এলা কাম নাই বল্লে চলে। সিজেনে সিজেনে টুকটাক ডাক আইসে। তায় কোনো মতন করি চলছুং।’
আকবার আলীর কথায় স্পষ্ট, সময়ের সঙ্গে তার পেশার চাহিদা কমেছে। আগে চাষাবাদের মৌসুমে কাজের অভাব ছিল না। কৃষকরা জমি চাষের জন্য তাকে ডাকতেন। এখন ট্রাক্টরসহ আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গরুর হাল চাষের কাজ অনেকটাই কমে গেছে। মৌসুমে দু-একটি কাজ পেলেও তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে।
গ্রামীণ জনপদেও পৌঁছে গেছে আধুনিক কৃষিযন্ত্র। জমি চাষে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের ব্যবহার বাড়ায় কমেছে গরুর হালের প্রয়োজন। এতে একদিকে কৃষিকাজ সহজ ও দ্রুত হয়েছে, অন্যদিকে আকবার আলীর মতো হালচাষিদের জীবিকায় পড়েছে প্রভাব।
স্থানীয় গেরস্ত আরমান বাদশা বলেন, ‘আগে জমি চাষের জন্য গরুর হালের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন ট্রাক্টর দিয়ে অল্প সময়েই অনেক জমি চাষ করা যায়। তাই গরুর হাল চাষের প্রয়োজন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এখন হাতে গোনা কয়েকজন এই পেশায় আছেন।’
শুধু একটি পেশাই নয়, হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহ্যও। একসময় গ্রামের শিশু-কিশোরদের কাছে গরুর হাল চাষ ছিল পরিচিত দৃশ্য। এখন অনেকের কাছেই তা অজানা। কেউ কেউ জানেই না, একসময় গরু দিয়ে জমি চাষ করা হতো।
এ বিষয়ে কয়েকজন শিশু-কিশোরের সঙ্গে কথা বললে তাদের মধ্যে দেখা যায় কৌতূহল। আধুনিক যন্ত্রের যুগে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের কাছে গরুর হাল চাষ অনেকটাই নতুন অভিজ্ঞতা।
শিক্ষার্থী মারিয়াম জান্নাত বলে, ‘আধুনিক যুগে গরু দিয়ে হাল চাষ করা যায়, তা আমার জানা ছিল না। এখন তো জমি চাষ করতে ট্রাক্টর দেখি। গরু দিয়ে লাঙল টেনে জমি চাষের বিষয়টি আমার কাছে নতুন মনে হয়েছে।’
শিক্ষার্থী নূর হোসেন তিতাস বলেছেন, ‘আমরা এখন জমি চাষ করতে ট্রাক্টর ব্যবহার করতে দেখি। আগে গরু দিয়ে জমি চাষ করা হতো, তা খুব একটা জানা ছিল না। এভাবে গরু দিয়ে জমি চাষের দৃশ্য এখন সচরাচর চোখে পড়ে না।’
আকবার আলীর লাঙল চালানোর দৃশ্য হয়তো একসময় পুরো গ্রামের কাছে স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই দৃশ্যই এখন নতুন প্রজন্মের কাছে বিস্ময়ের বিষয় হয়ে উঠছে। আধুনিক কৃষির অগ্রযাত্রায় ট্রাক্টর ও অন্যান্য যন্ত্র কৃষিকাজকে সহজ ও দ্রুত করেছে। তবে সেই পরিবর্তনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক মানুষের দীর্ঘদিনের পেশা, অভিজ্ঞতা আর গ্রামীণ ঐতিহ্য। আকবার আলী এখনো লাঙল হাতে মাঠে নামেন। ৩৫ বছরের অভ্যাস আর জীবিকার টানে ধরে রেখেছেন বাপ-দাদার পেশা। কিন্তু তার মতো হালচাষির সংখ্যা কমে আসায় একসময় গ্রামবাংলার পরিচিত এই দৃশ্যও হয়তো স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।




