‘লেবুর গ্রাম’ বৈলতলা

ছবি: আগামীর সময়
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া সদর ইউনিয়নের বৈলতলা গ্রামে ব্যাপক হারে লেবুর চাষ হওয়ায় গ্রামটি এখন ‘লেবুর গ্রাম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে এ গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লেবু চাষ করছেন কৃষকেরা।
৩০ বছর আগে শুরু হওয়া লেবু চাষ এখন বৈলতলার প্রতিটি চাষির প্রথম পছন্দ। নিবিড় সবুজ পাতার ভেতর থেকে উঁকি দেয় কাগজি, এলাচি আর কলম্বো জাতের লেবু। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। লেবুর সুবাসে প্রাণও জুড়ায়।
সরেজমিনে বৈলতলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, যেদিকে দু-চোখ যায়, শুধু লেবুর বাগান। প্রতিটি বাগানে চলছে কর্মযজ্ঞ। সামনে রমজান মাসকে সামনে রেখে বাগান পরিষ্কার করে সার দেওয়ার কাজ চলছে। এ ছাড়া কেউ শ্রমিক দিয়ে গাছ থেকে লেবু তুলছেন, কেউ বাগান থেকে ঝুড়িতে করে লেবু রাস্তার পাশে জমা করছেন। কেউ ছোট-বড় ও পাকা লেবু বাছাই করছেন, আবার কেউ খাঁচিতে করে বিক্রির জন্য লেবু গাড়িতে তুলছেন।
সাটুরিয়ার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক জানান, সাটুরিয়া উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১১০ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার বৈলতলা গ্রামেই ৯০ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হয়েছে। বৈলতলা গ্রামটি লেবু চাষের জন্য বিখ্যাত। সারা বছরই গ্রামের বাগান থেকে লেবু তুলে বিক্রি করেন চাষিরা। এ এলাকার লেবুর চাহিদা দেশজুড়ে।
বৈলতলা গ্রামের লেবুচাষি আবদুল মালেক (৭৬) বলেন, তিনি পৌনে দুই বিঘা জমিতে লেবুর চাষ করেছেন। গত ২০ বছর ধরে তিনি লেবু চাষ করছেন। একসময় তাদের গ্রামের বাড়ির আঙিনা থেকে লেবু চাষ শুরু হয়েছিল। ৩০ বছরে বৈলতলা পুরোপুরি লেবুর গ্রামে পরিণত হয়েছে।
২৫ বছর ধরে লেবু চাষ করছেন বৈলতলা গ্রামের আরেক চাষি শাহ আলম (৫০)। তিনি বলেন, সাড়ে তিন বিঘা জমিতে তার লেবুর বাগান রয়েছে। একবার লেবুর চারা রোপণ করে যথাযথ পরিচর্যা করলে ১০ থেকে ১২ বছর ফলন পাওয়া যায়। বছরে চারবার ব্যাপকভাবে লেবু সংগ্রহ করা যায়। এ ছাড়া সারা বছরই বাগান থেকে কমবেশি লেবু তুলে বিক্রি করা যায়। এ গ্রামের লেবু কুমিল্লার নিমসার ও রাজধানীর কারওয়ান বাজারের আড়তসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি হয়।
বৈলতলা গ্রামে প্রথম দিকে লেবু চাষ শুরু করা খোরশেদ আলম (৬৮) বলেন, একসময় তাদের এলাকায় আখের চাষ হতো। প্রায় ৩০ বছর আগে তারা লেবু চাষ শুরু করেন। অন্য ফসলের তুলনায় লেবু চাষে লাভ বেশি হওয়ায় গ্রামের সবাই লেবুর আবাদ শুরু করেন। এভাবেই বৈলতলা গ্রামটি ‘লেবুর গ্রাম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
বৈলতলা গ্রামের লেবুর পাইকার আজাহার (৫৬) বলেন, এ বছর তিনি এক বছরের জন্য ছয় বিঘা জমির লেবুর বাগান দুই লাখ ২০ হাজার টাকায় কিনেছেন। শ্রমিকের মজুরি, সার ও সেচের খরচ বাদ দিয়ে তার দুই লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন। প্রতি বছরই তিনি লেবুর বাগান কিনে পরিচর্যা করেন এবং লেবু তুলে বিক্রি করে লাভবান হন। লেবুর দাম বেশি থাকলে লাভ বেশি হয়, আর দাম কম থাকলে লাভও কম হয়।
সাটুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, তার বাড়িও বৈলতলা গ্রামে। তিনিও নিজের নয় বিঘা জমিতে লেবুর আবাদ করেছেন। বৈলতলা গ্রামটি ‘লেবুর গ্রাম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এ গ্রামের প্রায় সবাই লেবু চাষের সঙ্গে জড়িত। প্রায় ৩০ বছর আগে বৈলতলা গ্রামের নিজাম উদ্দিন নামের এক সবজি ব্যবসায়ী প্রথম লেবু চাষ শুরু করেন। পরে চাষটি লাভজনক হওয়ায় ধীরে ধীরে এলাকার অন্যরাও লেবু চাষ শুরু করেন। প্রতিদিন এ গ্রাম থেকে লেবুভর্তি গাড়ি দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. তানিয়া তাবাসসুম বলেন, সাটুরিয়া উপজেলার বৈলতলা গ্রামেই সবচেয়ে বেশি লেবুর বাগান রয়েছে। এ গ্রামের উৎপাদিত লেবুর চাহিদা দেশজুড়ে। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন এ অঞ্চলে লেবু চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বৈলতলা গ্রামটি স্থানীয়ভাবে ‘লেবুর গ্রাম’ নামে পরিচিত। এ গ্রামের চাষিরা এলাচি, সিডলেস, কলম্বো, কাগজি ও স্থানীয় জাতের লেবু চাষ করেন।




