হত্যার বিচার ভিন্ন খাতে নিতেই অভিযুক্তের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড— সন্দেহ রিয়ার পরিবারের

ছবি: আগামীর সময়
পাবনার ভাঁড়ারা ইউনিয়নে কিশোরী রিয়া হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অভিযুক্ত নাঈমের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন তিন যুবক। নিহত রিয়ার পরিবারের সন্দেহ, হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া ভিন্ন খাতে নিতে তৃতীয় কোনো পক্ষ পরিকল্পিতভাবে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে।
অন্যদিকে নিহত যুবকদের স্বজনদের দাবি, প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গত ২ জুন রাঘবপুর গ্রামে কিশোরী রিয়াকে শ্বাসরোধে হত্যার পর তার প্রেমিক নাঈম মরদেহ নদীতে ফেলে দেন। পরদিন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ এবং মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে। ৪ জুন রিয়ার দাফন শেষে উত্তেজিত জনতা নাঈমের বাড়িতে আগুন দেয়। এ সময় ঘরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে পাঁচজন দগ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সুমন শেখ এবং মঙ্গলবার সাব্বির ও সাপু মারা যান।
পরিবারের দাবি, তারা অগ্নিকাণ্ডের সময় আগুন নেভাতে যাওয়া প্রতিবেশী ও উৎসুক জনতা ছিলেন।
মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে রাঘবপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকা থমথমে। নিহত রিয়ার বাড়িতেও এখনও শোকের আবহ। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন রিয়ার মা-বাবা। অসুস্থ হয়ে পড়ায় দুজনের শরীরেই স্যালাইন চলছে।
রিয়ার বড় ভাই খালিদ হাসান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘হত্যায় অভিযুক্ত নাঈম আমাদের আত্মীয়। সে যে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে, তা কোনোদিন কল্পনাও করিনি। ৪ জুন বিকেলে বোনের মরদেহ দাফন করতে না করতেই দেখি নাঈমের বাড়িতে আগুন জ্বলছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন পুড়ে যায়।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমার বোন তো চলেই গেছে। পুলিশ দ্রুততার সঙ্গে আসামি গ্রেপ্তার করেছে, সে দায়ও স্বীকার করেছে। আগুন দেওয়ার তো কোনো কারণ নেই। আমি বোন হত্যার বিচার চাই। আর কারও প্রতি কোনো অভিযোগ নেই।’
রিয়ার বোন প্রিয়া খাতুন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘বোন হারিয়ে আমরা শোকাহত। মা-বাবা পাগলপ্রায়, অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। রিয়ার মৃত্যুর পর দুদিন কেটে যায় মরদেহ পেতে। আমাদের স্বজনরা কারও বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের কথা চিন্তাও করেনি। হঠাৎ দাফনের সময় এমন ঘটনা পরিকল্পিত কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।’
পূর্ব রাঘবপুর গ্রামে নিহত সুমন শেখের ভাতিজা শাকিল শেখ জানালেন, আমার চাচা রিয়ার দাফন শেষে ফেরার পথে আগুন নেভাতে গিয়ে পুড়ে মারা গেছেন। কে বা কারা আগুন দিয়েছে, আমরা কিছুই জানি না।
মরদেহের জন্য অপেক্ষমাণ সাপুর চাচাতো ভাই আজাদ শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, ‘রিয়া হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ এলাকায় নিরাপত্তায় গাফিলতি না করলে আজ এতগুলো প্রাণহানি হতো না। অন্তত দাফনের সময় উত্তেজিত জনতার সহিংসতা রুখতে তাদের কোনো তৎপরতা ছিল না।’
একই অভিযোগ করেন সাপুর চাচা সবুজ শেখ। তার ভাষ্য, ‘রিয়ার মৃত্যুতে তার স্কুলের সহপাঠীরা মহাসড়ক অবরোধ করেছে, এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এরপরও পুলিশ কেন ব্যবস্থা নিল না, সহিংসতা এড়াতে পারল না, সেটিই বড় প্রশ্ন।’
গ্রামের বাসিন্দা শারমিন আরা বলেন, ‘একজনের অপরাধে পুরো গ্রামের পরিবেশ এলোমেলো হয়ে গেল। আমরা এখন কীভাবে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাব, মানুষ করব, তা নিয়েই আতঙ্কে আছি। এমন প্রতিবেশীদের মধ্যেই যদি এমন সহিংসতা হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া উচিত।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রবীণ গ্রামবাসী দাবি করেন, কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি লুটপাটের উদ্দেশ্যে দাফনের সময় অভিযুক্তের বাড়িতে পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছিল। অনেকেই তখন ঘটনাস্থলে শুধু পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছিলেন। অগ্নিসংযোগের পর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তারা দগ্ধ হন।
এ ঘটনায় নিহত সুমন শেখের ভাই সবুজ শেখ বাদী হয়ে মঙ্গলবার পাবনা সদর থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন।
তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কোনো গাফিলতি ছিল না বলে দাবি করেছে পুলিশ।
পাবনা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনূর রহমান বললেন, ‘হত্যাকাণ্ডের আসামি গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তির পর সহিংস অগ্নিসংযোগের ঘটনা অনভিপ্রেত। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’





