বালু তোলা চলছেই, ঝুঁকিতে ১৬৮ কোটির মুহুরী স্লুইসগেট
- ৬ পয়েন্টে তোলা হচ্ছে অবৈধ বালু
- আগে ছিল আ. লীগের দখলে, এখন বিএনপির
- আরও ঝুঁকিতে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৪ টাওয়ার

মুহুরী স্লুইসগেট। ছবি: আগামীর সময়
সোনাগাজীর কৃষি এলাকায় সেচ সুবিধা দেওয়া, নদী শাসন ও ফেনী নদীর পানি নিয়ন্ত্রণে ১৯৮৪ সালে ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে হয় মুহুরী রেগুলেটর বা স্লুইসগেট। সদর ইউনিয়নের থাক খোয়াজের লামছি মৌজায় হওয়া এই স্লুইসগেট ৪০ বছর ধরে সোনাগাজী-মীরসরাইসহ বিশাল এলাকায় চাষাবাদসহ বিভিন্ন কাজে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলের পানি আটকে রাখা হয় এই স্লুইসগেটের মাধ্যমে। প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বের করে দেওয়া হয় পানি। সেই পানি গিয়ে মেশে বঙ্গোপসাগরে। আর আটকে থাকা পানি কাজে লাগে দুই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি জমিতে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই রেগুলেটরের মাত্র তিন থেকে চারশ গজের মধ্যে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু। ফলে ব্যয়বহুল এই স্থাপনা এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ড. জি এম সাদিকুল ইসলাম বলছিলেন, ‘বালু উত্তোলন করতে হলে নদীতে ঠিক কতটুকু সিলটেশন (পলি জমা) হলো, তা আগে নিরীক্ষা করে দেখা দরকার। প্রক্রিয়াটি অবশ্যই সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হওয়া উচিত। বেপরোয়া ও খেয়ালখুশিমতো বালু উত্তোলন প্রতিযোগিতা হলে যেকোনো মুহূর্তে বড় স্থাপনা ধসে পড়া বা ঝুঁকিতে পড়ার তীব্র আশঙ্কা থাকে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, মুহুরী স্লুইসগেটের দক্ষিণে থাক খোয়াজের লামছি এলাকায় আধা কিলোমিটার জুড়ে কমপক্ষে ১০ ড্রেজার মেশিন বসিয়ে তোলা হচ্ছিল বালু। আছে একাধিক বাল্কহেড। এসব বাল্কহেডে বালু জমিয়ে পরে বালু মহালের স্তূপে জড়ো করা হচ্ছে। সেখান থেকে পিকআপ ও ট্রাকে পাঠানো হয় বিভিন্ন গন্তব্যে।
সর্বশেষ ২০২৩ সালে মেসার্স রানা এন্টারপ্রাইজ মুহুরী প্রকল্পের দক্ষিণে বালুরঘাট ইজারা নেয় বার্ষিক ৭৫ লাখ টাকায়। এ হিসাবে প্রতি ফুট বালুর ইজারা মূল্য ৫ থেকে ৬ টাকা। যদিও ২০২৪ সাল থেকে বন্ধ ইজারা।
বালু উত্তোলনকারীদের ভাষ্য, মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় যেসব বালু তোলা হচ্ছে তার প্রতি ফুট খরচ গড়ে ১৫ থেকে ১৮ টাকা। বিক্রি ২৫ থেকে ৩০ টাকা। ১০০ ফুটের পিকআপ ভরে দিলে নেওয়া হয় ৩ হাজার টাকা। প্রতিদিন তোলা যায় ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার ফুট বালু।
ঝুঁকিতে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৪ টাওয়ার
শুধু মুহুরী রেগুলেটর নয়। ইজারাবিহীন বালু উত্তোলনে ঝুঁকিতে দেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৪ টাওয়ার। ২০০৩ সালে নেবুলা টেকনো সলিউশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান সমুদ্রপাড়ের বাতাস কাজে লাগিয়ে প্রকল্পটি স্থাপন করে। বর্তমানে এটি বন্ধ। তবে যেকোনো সময় প্রকল্পের টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
বালু মহাল ঘুরে দেখা গেল, প্রতিনিয়ত ভারী যানবাহনে বালু পরিবহনের কারণে মুহুরী রেগুলেটর থেকে বায়ুবিদ্যুতের আরসিসি ঢালাই সড়কটি প্রায় পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এসব বিষয় নিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন পরিবেশ মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু।সম্প্রতি সোনাগাজী সফরকালে সাংবাদিকদের তিনি বলছিলেন, ‘যে বা যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে থাকুক না কেন— তাদের ব্যপারে আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো বালু উত্তোলন করা যাবে না।’অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি জানেন এবং রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার কৌশল থেকে তারাও সুবিধাভোগী। অবশ্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিগান চাকমা জানাচ্ছিলেন, ‘ওই এলাকায় কোনো বালু উত্তোলনের ইজারা দেওয়া হয়নি। প্রশাসন এসব বালু লুটেরাদের বিরুদ্ধে সবসময় অভিযান পরিচালনা করে।’ প্রশ্ন হলো, অভিযান পরিচালনা করা হলে বিভিন্ন গন্তব্যে প্রতিদিন অসংখ্য পিকআপে বালু যাচ্ছে কীভাবে?




