বাংলার প্রথম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব বহন করছে সোনারগাঁ

ছবি: আগামীর সময়
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ বহন করে চলেছে বাংলার প্রাচীন ইসলামি জ্ঞানচর্চার গৌরবময় ইতিহাস। মোগরাপাড়ার ষোলপাড়ায় জ্ঞানতাপস শেখ শরফ্ উদদীন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত হাদিসচর্চাকেন্দ্র ও ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র একসময় দেশ-বিদেশের জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করেছিল। সময়ের প্রবাহে মূল স্থাপনার অধিকাংশ বিলীন হলেও তার মাজার ও কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো সেই ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন দর্শনার্থী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ ষোলপাড়ায় এসে শেখ শরফ্ উদদীন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। ইতিহাস, ধর্মীয় শিক্ষা ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহীদের কাছেও স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসবিদদের মতে, শেখ শরফ্ উদদীন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে, তিনি পারস্যের বুখারা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। আবার কারও মতে, তার জন্ম ইয়েমেনে। আনুমানিক ১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের শাসনামলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি দিল্লিতে আসেন। পরে সেখান থেকে বাংলায় আগমন করেন।
তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ইসলামি আইনবিদ, সমাজসংস্কারক ও বহুমুখী জ্ঞানসাধক। ভেষজবিদ্যা, গণিত, ভূগোল ও রসায়নেও তার বিশেষ পাণ্ডিত্য ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
বাংলায় এসে তিনি সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়ার ষোলপাড়ায় ‘সোনারগাঁ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়েও পাঠদান করা হতো। অল্প সময়ের মধ্যেই এ শিক্ষাকেন্দ্রের খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লিসহ দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞানচর্চার জন্য আসতেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় একসময় এ বিদ্যাপীঠে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করতেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
শেখ শরফ্ উদদীন আবু তাওয়ামা (রহ.) প্রায় ২৩ বছর এই শিক্ষাকেন্দ্রে অধ্যাপনা করেন। তিনি সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ কিতাব পাঠদান করতেন। ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দে তার মৃত্যু হলে ষোলপাড়ায় তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে সেখানে পাশাপাশি ছয়টি মাজার রয়েছে। এর মধ্যে সবুজ রঙের মাজারটি শেখ শরফ্ উদদীন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর বলে পরিচিত।
ইছাপাড়া এলাকার একটি কওমি মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা মোবারক হোসেন উল্লেখ করেন, শেখ শরফ্ উদদীন আবু তাওয়ামা (রহ.) প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাকেন্দ্রটি উপমহাদেশে ইলমে হাদিসচর্চার অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ বিদ্যাপীঠ ছিল।
কবি আবদুল হাই শিকদার তার ‘সোনারগাঁও: অন্তরে বাহিরে রূপকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, শেখ শরফ্ উদদীন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর মৃত্যুর পরও শিক্ষাকেন্দ্রটি সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের শাসনামল পর্যন্ত টিকে ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রাজা গণেশের ক্ষমতায় আরোহনের সময় এটি ধ্বংস হয়ে যায় বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোছাঃ নাহিদ সুলতানা জানিয়েছেন, শেখ শরফ্ উদদীন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর মাজার ও প্রাচীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানটি তিনি এ সপ্তাহে পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শনের পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে স্থানটি সংরক্ষণের পরিকল্পনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস জানিয়েছেন, সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া এলাকায় আনুমানিক ১২৭৮ খ্রিষ্টাব্দে উজবেকিস্তান থেকে আগত প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও পণ্ডিত শেখ শরফ্ উদদীন আবু তাওয়ামা একটি হাদিসচর্চা ও শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে দেশ-বিদেশে এ শিক্ষাকেন্দ্রের ব্যাপক পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞানচর্চার জন্য আসতেন। শিক্ষাকেন্দ্রটির পাশেই ছিল একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার।
শাহেদ কায়েসের ভাষ্য, কালের প্রবাহে মূল স্থাপনার অধিকাংশ বিলীন হয়ে গেলেও কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো টিকে রয়েছে। সোনারগাঁয়ের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রত্নঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে এসব নিদর্শন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
ইতিহাসবিদদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্থানকে দেশের ইসলামি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব।




