গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে শ্রেণিকক্ষে

এই সাঁকোটি পেরিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হচ্ছে। এতে রয়েছে ঝুঁকি, ছবি : আগামীর সময় প্রতিনিধি
দেশজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার নানা উদ্যোগ চললেও গাজীপুরের টঙ্গীর ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের সাতাইশ এলাকার গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। খালের মাঝখানে অনেকটা দ্বীপের মতো অবস্থান করা ১১২ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই সাঁকো পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।
জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯১২ সালে গুটিয়া, আন্দারুল, গুশুলিয়া ও রাজনগর গ্রামের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ১১২ বছর ধরে বিদ্যালয়টি ওই এলাকার শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য খালের ওপর নির্মিত বাঁশের সাঁকোটিই একমাত্র সহজ পথ।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষা মৌসুমে খালে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্রোতও তীব্র হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে বাঁশের তৈরি সাঁকোটিও হয়ে পড়েছে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। সাঁকোটি পার হওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যই কঠিন; সেখানে সাত-আট বছরের কোমলমতি শিশুদের প্রতিদিন পিচ্ছিল ও নড়বড়ে বাঁশের ওপর দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। কোনো শিক্ষার্থী পা পিছলে খালে পড়ে গেলে স্রোতের টানে দূরে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা।
সরেজমিন দেখা যায়, বাঁশের সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ শুকিয়ে ও নষ্ট হয়ে গেছে। মাঝখানে বেশ কয়েকটি বাঁশের ফাঁক রয়েছে। একসঙ্গে চার-পাঁচজন শিক্ষার্থী সাঁকোর ওপর উঠলে সেটি হেলে দুলতে থাকে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকারা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে শিশুদের হাত ধরে সাঁকো পার করে দিচ্ছেন।
শুধু যাতায়াতের সমস্যাই নয়, বিদ্যালয়টিতে নেই কোনো বাউন্ডারি দেয়াল। খেলার মাঠটিও অসমতল। শিক্ষার্থীরা মাঠেই খেলাধুলা করে। খেলতে গিয়ে ফুটবল প্রায়ই খালের পানিতে পড়ে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
স্থানীয়দের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোর কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন উপস্থিতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশও স্বাভাবিক হবে।
বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কাজী ফারুক হাসান তুহিন বলে, বাঁশের তৈরি ভাঙা সাঁকো দিয়ে স্কুলে আসতে ভয় লাগে। আমরা এখানে একটি ভালো ব্রিজ চাই।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শুভশ্রী মল্লিক জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়ে বিদ্যালয়ে আসার সময় একবার পড়ে গিয়ে সে গুরুতর আঘাত পেয়েছিল। বাঁশের সাঁকোর পরিবর্তে একটি নিরাপদ ও স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানায় সে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা খায়রুন নেছা বলেন, ২০১৫ সালে বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই তিনি একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। নির্বাচন এলেই অনেক সময় সাময়িকভাবে সাঁকোটি সংস্কার করা হয়। তবে কিছুদিন পর আবার সেটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় অনেক সময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে অথবা এলাকাবাসীর সহযোগিতায় সাঁকোটি জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করে ব্যবহার করে আসছে।
তিনি বলেন, শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্থায়ী ও টেকসই সেতু ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের কাছে দ্রুত একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।
ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারের বিষয়টি স্বীকার করে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, অঞ্চলটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হওয়ায় ব্রিজ নির্মাণের প্রাথমিক দায়িত্ব তাদের। তবে সিটি করপোরেশন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
এক শ বছরের বেশি সময় ধরে এলাকার শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসা গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসা শিশুদের জন্য আর সাময়িক সংস্কার নয়, প্রয়োজন একটি স্থায়ী ও টেকসই সেতু। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবে।



