নওগাঁ
ভরা মৌসুমেও চড়া চালের দাম, বাজারে অশনি সংকেত

নওগাঁয় ধানের সরবরাহ বাড়লে কমেনি চালের দাম। ছবি: আগামীর সময়
বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যজুড়ে বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ব্যস্ততা শেষ হয়েছে। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কৃষকরা ঘরে তুলেছেন নতুন ফসল। বাজারে বেড়েছে নতুন ধানের সরবরাহও। কিন্তু এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি চালের বাজারে। বরং ভরা মৌসুমেও বেড়েছে চালের দাম। মিলগেট থেকে পাইকারি বাজার—সবখানেই ঊর্ধ্বমুখী দাম। ফলে ভোক্তাদের বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে চাল। একই সঙ্গে ধানের অবৈধ মজুদ ও বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটের অভিযোগে চালের বাজারে নতুন করে তৈরি হয়েছে অস্থিরতার শঙ্কা।
দেশে চালের প্রধান যোগান আসে বোরো মৌসুম থেকে। চলতি মৌসুমে ধান উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে সেই সুফল মিলছে না। কৃষকরা ফলনে খুশি হলেও ধানের দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট। অন্যদিকে ভোক্তাদেরও স্বস্তি নেই। চলতি মাসের শুরুতে মিলগেট ও পাইকারি বাজারে প্রায় সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিলার ও ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে ধানের দাম নির্ধারণ করছেন। কম দামে ধান কিনে বেশি দামে চাল বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
ধান-চালের অন্যতম বড় মোকাম নওগাঁ। বিশেষ করে সরু জাতের ধান উৎপাদনে জেলার সুনাম রয়েছে। এখানে কাটারি, জিরাশাইল, পাইজাম ও সুবর্ণলতা জাতের ধান বেশি চাষ হয়। কৃষকদের ভাষ্য, জেলার মোট বোরো আবাদি জমির প্রায় ৫০ শতাংশে কাটারি, ২০ শতাংশে জিরাশাইল এবং ৭ থেকে ৮ শতাংশ জমিতে সুবর্ণলতা চাষ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে নওগাঁ জেলায় এক লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টন ধান। উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলাতেও এ বছর বোরোর ফলন ভালো হয়েছে।
বৈশাখের শুরু থেকেই নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হয়। বর্তমানে অধিকাংশ কৃষকই ধান ঘরে তুলেছেন। অনেকেই ধান বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে আসছেন। তবে কৃষকদের অভিযোগ, বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত লাভ হচ্ছে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সে অনুযায়ী দাম বাড়েনি।
মাতাজি, মহাদেবপুর, মধইল, সাপাহার, শিশাহাট, সরস্বতীপুর, হাঁপানিয়া, চকগৌড়ি, চৌবাড়িয়া ও আবাদপুকুর এলাকার হাটগুলো ধান বেচাকেনার বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি চকগৌড়ি হাটে দেখা গেছে, আড়তদাররা কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে ট্রাকভর্তি করে বিভিন্ন মিল ও গুদামে পাঠাচ্ছেন।
বর্তমানে বাজারে কাটারি ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জিরাশাইলের দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং সুবর্ণলতা ধান সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা ধানের দাম প্রতি মণ প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। কৃষকদের অভিযোগ, নতুন ধান বাজারে উঠতেই ব্যবসায়ীরা দাম কমিয়ে দিয়েছেন।
মহাদেবপুর উপজেলার মাতাজি বটতলি গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম ও আজিজুল ইসলাম বলেছেন, ‘উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু ধানের দাম সে তুলনায় বাড়েনি। মিলার ও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে কম দামে ধান কিনছেন।’
তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। চকগৌড়ি হাটের ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেছেন, ‘নতুন ধান হিসেবে কৃষকরা ভালো দামই পাচ্ছেন। গত বছর একই ধান প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সে তুলনায় এ বছর দাম বেশি।’
অন্যদিকে ধানের বাজারে সরবরাহ বাড়লেও চালের বাজারে নেই তার কোনো প্রভাব। গত দুই সপ্তাহে মোটা ও মাঝারি চালের দাম কেজিপ্রতি দেড় থেকে দুই টাকা বেড়েছে। সরু চালের দাম বেড়েছে প্রায় তিন টাকা পর্যন্ত।
বর্তমানে মিলগেট ও পাইকারি বাজারে কাটারি নাজির চাল প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৭২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জিরাশাইল চালের দাম ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা। মোটা চালের দামও ৫৫ টাকার নিচে নামছে না।
ভরা মৌসুমে চালের দাম না কমার কারণ হিসেবে মিলাররা ধানের দাম বৃদ্ধির কথা বলছেন। তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ভোক্তা প্রতিনিধিরা বাজারে অবৈধ মজুদ ও সিন্ডিকেটের প্রভাবকে দায়ী করছেন।
নওগাঁর রাইস মিলার গোলাম মোস্তফা বলেছেন, ‘নওগাঁ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন বড় মোকামে পুঁজিপতি, মৌসুমি মজুদদার ও কিছু মিলার কম দামে ধান কিনে অবৈধভাবে মজুদ করছেন। পরে তারা নিজেদের সুবিধামতো চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। বাজারে কার্যকর তদারকির অভাবেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
তার দাবি, ইতোমধ্যেই সরু ধানের বড় অংশ কিছু প্রভাবশালী মিলার ও ব্যবসায়ীর গুদামে চলে গেছে। ফলে চালের বাজার অনেকটাই তাদের নিয়ন্ত্রণে। ক্ষুদ্র মিলাররা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।
তবে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেছেন, ‘দেশে বর্তমানে ধান-চালের কোনো সংকট নেই। সরকারি গুদামে সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে মোটা ধানের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে ধানের দাম বেড়েছে এবং তার প্রভাব চালের বাজারেও পড়েছে।’
নওগাঁ ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সদস্য নাইস পারভীন জানালেন, ধানের হাট, মিলগেট, পাইকারি ও খুচরা বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব রয়েছে। এর ফলে অবৈধ মজুত বাড়ছে এবং চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। দ্রুত বাজার তদারকি বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার বলেছেন, ‘চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারে নতুন ধান-চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো অজুহাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। আড়ত ও মিল পর্যায়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। কোথাও অসংগতি পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া লাইসেন্সবিহীন গুদাম ও অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে শিগগিরই যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, ধান-চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে অবৈধ মজুদ বন্ধ করা এবং উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে ভরা মৌসুমেও চালের বাজারে যে অস্থিরতার আভাস দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।






