বগুড়ায় হাসপাতালের বর্জ্যে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বগুড়ার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় তরল বর্জ্য শোধনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসাবর্জ্য শোধন ছাড়াই মিশছে নদী, ড্রেন ও জলাশয়ে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সভা, নোটিস ও তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জেলার সরকারি বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই কার্যকর তরল বর্জ্য শোধনাগার বা এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) নেই। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারসহ বিভিন্ন বিভাগ থেকে নির্গত তরল বর্জ্য শোধন ছাড়াই নালা ও পাইপলাইনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের জলাশয়ে।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসেছেন আব্দুল মোমিন। তার প্রশ্ন, ‘চিকিৎসা বর্জ্য যদি পানি ও পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে, তবে আমরা কোথায় যাব? এই দূষিত পরিবেশে সন্তানরা বড় হচ্ছে, নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ওষুধ খেয়েও কাজ হচ্ছে না।’
জেলার প্রধান দুই সরকারি হাসপাতাল শজিমেক ও ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালেও নেই এ ব্যবস্থা। শজিমেক হাসপাতালের তরল বর্জ্য সুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে করতোয়া নদীতে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে পাশের নার্সিং হোস্টেলের পুকুরে। বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বর্জ্যও ড্রেনের মাধ্যমে নদী এবং জলাশয়ে মিশছে।
শজিমেক হাসপাতালের উপপরিচালক মনজুর এ মুর্শেদের ভাষ্য, আগস্টে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার পর জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ইটিপি স্থাপনের বিষয়ে পরিদর্শন করেছে। তবে তার দাবি, হাসপাতালে ইটিপি পরিচালনার মতো দূষণ হয় না।
তবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মাজিদুল ইসলাম বললেন, আইন অনুযায়ী বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও নিজস্ব অর্থায়নে ইটিপি স্থাপন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তার আশা, সরকারিভাবে ইটিপি বা বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা হবে।
চিকিৎসা বর্জ্যের এমন অনিয়ন্ত্রিত নিষ্কাশন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে— মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি আজিজুল হক কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবু সাঈদের ভাষায়, চিকিৎসাবর্জ্য সাধারণ গৃহস্থালির বর্জ্যের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেললে জলজ প্রাণী ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার আশঙ্কা, দূষিত পানির মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় ৪২৫টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৭৬টির। অর্থাৎ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই।
চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা-২০০৮ সালের বিধিমালা অনুযায়ী, উৎসস্থলেই বর্জ্য হলুদ, লাল, সবুজ ও কালো পাত্রে আলাদা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এ নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। ফলে সংক্রামক ও ধারালো বর্জ্যের সঙ্গে সাধারণ বর্জ্য মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। শজিমেক হাসপাতালের কর্মী আজিবর রহমান জানালেন, সিরিঞ্জ, ইনজেকশনের সুঁই ও স্যালাইনের প্যাকেট আলাদা করতে গিয়ে তাদের হাত কেটে যায়। অনেক সময় খালি হাতেই এসব বর্জ্য ধরতে হয়।
বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনে পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে তাগিদ দিলেও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন ৫০০-এর বেশি মানুষের সমাগম হয়, সেখানে ইটিপির পাশাপাশি সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) অথবা সমন্বিত বর্জ্যপানি শোধনাগার স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে।
বেসরকারি টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ইটিপি থাকলেও সেটির নবায়ন নেই। এ ছাড়া ২০২৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ডক্টরস ক্লিনিক, শামসুন নাহার ক্লিনিক, হেলথ সিটি স্পেশালাইজড হসপিটাল, ইসলামী হাসপাতাল, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিকসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানকে নোটিস দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
অবশ্য ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপক শওকত ইসলামের দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের তাগিদের পর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ইটিপি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ বিষয়ে তাদের কাছে নির্দেশনা এসেছে।
জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। বগুড়া জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন এস এম নূর ই শাদীদ বলেছেন, ‘ইটিপি স্থাপনের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সিটি করপোরেশনে বৈঠক হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করছে।’
বর্জ্যের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহাথির বিন মোহাম্মদ। এতে কাজ না হলে সতর্ক করা হবে এবং ধারাবাহিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।



