টর্নেডো আতঙ্ক
মেঘ জমলেই শঙ্কা, একটু বাতাসেই আতঙ্ক

ফাইল ছবি
‘এখনো যদি একটু বাতাস দেখি, মনে হয় সেইডাই ফিরা আসলো নাকি, ভয়ে আতঙ্কে ঘরের ভিতর গিয়ে চেয়ে থাকি। মনে হয় আবার কি ঝড় আসলো, ঝড় বাতাস দেখলে ভয় লাগে। এ্যাতো ভয় লাগে যে মনে হয় সেই ঝড়ের তলে পরলামনি আবার।’
কথাগুলো মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার হরগজ পূর্বনগর গ্রামের ৫৮ বছর বয়সী আলী হোসেনের। ৩৭ বছর আগে দেখা ভয়াবহ টর্নেডো স্মৃতি এখনো তাড়া করে তাকে। একটু ঝড়ো বাতাসে পেয়ে বসে আতঙ্ক।
সেই টর্নেডোর তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়েছিল আলী হোসেনের ঘরবাড়িসহ পুরো গ্রাম। সেদিন নিহত হন তাদের বাড়িতে থাকা আ. বারেক নামের একজন।
১৯৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল। সাটুরিয়ার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় দিন। এই দিনে সাটুরিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ টর্নেডোর ৩৭ বছর পূর্ণ হলো আজ। এক মিনিটেরও কম সময়ের টর্নেডোতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পুরো জনপদ। প্রাণ হারান প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ। আহত হন অন্তত ১২ হাজার, আর প্রায় এক লাখ মানুষ হয়ে পড়েন গৃহহীন। শুধু ঘরবাড়ি নয়, ভেঙে পড়ে মানুষের মানসিক ভরসাও।
টর্নেডোর তিন যুগের বেশি সময় পরেও তার মতো সাটুরিয়ার হাজারো মানুষ আকাশে মেঘ দেখলেই আঁতকে ওঠে। আহতদের মনে এখনো ভয়, টর্নেডোর ক্ষত এখনো তাজা, মেঘ দেখলেই আঁতকে ওঠেন তারা।
সেই ভয়াল দিনে স্মৃতিচারণ করে কয়েকজন জানান, টর্নেডোর কয়েক দিন আগে থেকেই বৃষ্টি ছিল না। প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ মানুষ বৃষ্টির জন্য মোনাজাত করছিল। রমজানের দিন, সবাই ইফতারের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ঠিক তখনই পশ্চিম আকাশে জমে কালো মেঘ, ধীরে ধীরে নেমে আসে অন্ধকার।
মাগরিবের আগমুহূর্তে হঠাৎ বিকট শব্দে নিয়ে শুরু হয় ঝড়, যা মুহূর্তেই ভয়াবহ টর্নেডোতে রূপ নেয়। ঘণ্টায় ১৮০ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যাওয়া সেই ঝড়ে সাটুরিয়া, হরগজ, তিল্লী ও ফুকুরহাটি ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
এক মিনিটেরও কম সময়ের সেই তাণ্ডবে উড়ে যায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়ে গাছপালা, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ফসলি জমি। শত বছরের পুরনো সাটুরিয়া বাজারসহ চার শতাধিক দোকানপাট ধ্বংস হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় খাদ্যগুদাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো।
স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে আসে বিভীষিকার চিত্র। কারও দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছিল, কেউ আহত হয়ে আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়েছেন।
সাটুরিয়া উপজেলার চর সাটুরিয়া গ্রামের আরফান আলী (৫৬) জানান, ঝড়ের সময় দোকানে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস এসে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। মাথায় কাঠের আঘাত পাই, পায়ে টিন ঢুকে যায়। এখনো ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। ঘূর্ণিঝড়ে তার গ্রামের রাজ্জাক, কাদু, শিবুসহ প্রায় ১০ জন মারা যান। একজনের দেহ তিন খণ্ড হয়ে পড়েছিল। তিনি বললেন, যে ধ্বংসলীলা ঘূর্ণিঝড়ে দেখেছি এখনো আকাশে মেঘ দেখলে ভয় লাগে।
হরগজ গ্রামের ইব্রাহিম মাস্টার (৭৫) স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, কয়েক সেকেন্ডে সব শেষ হয়ে গেল। ঘরের ভিটাও উড়ে গেছে। শুধু আমাদের গ্রামেই দুই শতাধিক মানুষ মারা যায়। এখনো আকাশে মেঘ করলে সজাগ থাকি। ঘরের ভেতর গিয়ে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করি।
আয়েশা বেগম (৮০) কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, ঝড়ে আমার পুত্রবধূর বুকের মধ্যে কাঠ ঢুকে মারা যায়। ছেলের বিয়ে দিয়েছিলাম মাত্র এক বছর আগে। সেই কথা মনে পড়লেই বুক ফেটে যায়।
মমতাজ বেগমের স্মৃতি আরও শিহরিত। তিনি বললেন, টর্নেডোর দিন তিনি বাড়ির পাশ থেকে মাটি আনছিলেন। হটাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে আকাশ আগুনের মতো লাল হয়ে যায়। দৌড়ে ঘরে গিয়ে বাচ্চাকে কোলে নিতে নিতে ঝড় শুরু হয়ে ঘরের চাল বেড়া সব উড়িয়ে নিয়ে গেল। পরে বাচ্চাকে কাথা দিয়ে মুড়িয়ে ঢেকে রাখি। সে দিনের কথা মনে পরলে ভয়ে শিহরে ওঠে শরীর।
উপজেলার পূর্ব নগড় গ্রামের মো. আলী (৬২) জানান, টর্নেডোর দিন পশ্চিম থেকে আকাশ লাল রঙ ধারণ করে। তারপর এক মিনিটেরও কম সময়ে সব শেষ। আমাদের এলাকার সবার ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। আমিসহ বহু লোক আহত হয়। নিহত হয় কয়েক শতাধিক মানুষ। সে দিনের যে ঝড়ের স্মৃতি, আজও আকাশে মেঘ দেখলে ভয় ধরায়।
সাটুরিয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আখম নুরুল হক জানান, সে সময় তিনি ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান। টর্নেডোর সময় ছিলেন সাটুরিয়ার বাসায়। হটাৎ ঝড় শুরু হলে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনসহ নিরাপদে আশ্রয় নেন। কিছুক্ষণ পর বের হয়ে দেখেন সব শেষ, মাটির সাঙ্গে মিশে গেছে। গ্রামের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তার ছোট ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরের দিন সকালে পাশের গ্রামের চকে তার লাশ পাওয়া যায়।
তিনি আরও জানান, টর্নেডোর বাতাসের বেগ এত প্রখর ছিল যে, খাদ্যগুদামের সামনে থেকে গমভর্তি একটি ট্রাক উড়িয়ে গাজিখালি নদীর ওপারে নিয়ে যায়। টর্নেডোর খবর পেয়ে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু করে।
নুরুল হক জানান, এত ভয়াবহ দুর্যোগের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকারিভাবে একটি দিবস ঘোষণা করা উচিত।
টর্নেডোর তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মানুষের মনে সেই ভয় অমলিন। আকাশে মেঘ জমলেই আতঙ্ক ফিরে আসে। অনেকেই এখনো ঝড়ের শব্দ শুনলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যান।
১৯৮৯ সালের এই সাটুরিয়া টর্নেডোকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এটি অন্যতম বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃত।
টর্নেডো আঘাত হানার পরপরই সেনাবাহিনীসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। হরগজ কবরস্থান ও ঈদগাহ মাঠে জরুরি বৈঠক করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সাটুরিয়ার মানুষ আজও সেই দিনের কথা ভুলতে পারেনি। তাদের কাছে ২৬ এপ্রিল মানেই শোকের দিন, আতঙ্কের দিন।



