কুড়িগ্রামে সার নিয়ে থামছে না শোরগোল
- ১৫ দিনের ব্যবধানে দুই ডিলারের গোডাউনের সার লুট
- খুচরায় সার পাচ্ছেন না অধিকাংশ কৃষক
- গুনতে হচ্ছে কেজিতে বাড়তি ২-৮ টাকা পর্যন্ত
- ভুট্টা-আলুর জন্য মজুদে কিছুটা সংকট—দাবি কৃষি বিভাগের

ভুরুঙ্গামারীতে খোলা বাজারে সার বিক্রির দাবিতে সড়কে কৃষকদের বিক্ষোভ। ছবি: আগামীর সময়
ঘামে ভেজা হাত, চোখে চরম অনিশ্চয়তা। সারের একটি বস্তার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইন। কোথাও হট্টগোল, কোথাও আবার রাস্তায় নামছেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। সব মিলিয়ে কুড়িগ্রামে আমন মৌসুমে সার নিয়ে সংকট নিয়েছে চরম আকার। ক্ষুব্ধ কৃষকদের হাতে ১৫ দিনের ব্যবধানে লুট হয়েছে দুই ডিলারের গুদাম।
যদিও সরকারি খাতায় সারের নেই কোনো ঘাটতি। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডিলারদের কাছে গেলে মিলছে না সার। অধিকাংশ জায়গায়ই বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি গুনতে হচ্ছে বাড়তি ২ থেকে ৮ টাকা।
গত ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নে সার না পেয়ে গোডাউন লুট করেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। তদন্তে বেরিয়ে আসে ডিলারের গাফিলতির তথ্য। এর ১৫ দিনের ব্যবধানে গত ৭ সেপ্টেম্বর রৌমারীর গুদাম ভেঙে সার নিয়ে গেলেন আরেক দল কৃষক। একই দিনে অন্য এক ডিলার পয়েন্টে পরিস্থিতি সামলাতে মোতায়েন করতে হয় পুলিশ ও বিজিবি।
অথচ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে অন্য কথা। চলতি সেপ্টেম্বরে জেলায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের রয়েছে পর্যাপ্ত বরাদ্দ। তবে মাঠের চিত্র পুরো উল্টো। কৃষকদের অভিযোগ, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ডিলাররা সার লুকিয়ে রাখছেন গোপন গোডাউনে। আবার অসাধু চক্র ও কিছু কৃষক আলু এবং ভুট্টার জন্য আগাম সার মজুদ করায় সংকট ঘনীভূত হচ্ছে আরও।
জেলায় গত তিন দিনে আলাদা আলাদা উপজেলার একাধিক পয়েন্টে সার না পেয়ে হট্টগোল, সড়ক অবরোধসহ নানান প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেন বিক্ষুব্ধ কৃষকরা। লুটপাট ও বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নের শাহ আমানত ট্রেডার্সের ডিলার পয়েন্টে। সেখান থেকে সার লুট করে নিয়ে যান কৃষকরা। যদিও পরে লুট হওয়া সারের অধিকাংশ ফেরত দেন তারা। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করে ডিলারের গাফিলতি পায় উপজেলা প্রশাসন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি আমন মৌসুমে কুড়িগ্রামে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইউরিয়া সারের অনুমোদিত বরাদ্দ ৫৩ হাজার ৯৫০ টন। আর চলতি সেপ্টেম্বরে জেলায় চাহিদা ও বরাদ্দ অনুযায়ী সব সার পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ৪ হাজার ৬৪৪ টন, যার মধ্যে ডিলাররা উত্তোলন করেছেন ২ হাজার ১২৯ টন। টিএসপি সারের চাহিদা ছিল ৭০০ টন, ডিলাররা উত্তোলন করেছেন ৩২৬ টন। ডিএপি সারের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৯১০ টন, ডিলাররা উত্তোলন করেছেন ৮৩৫ টন। আর এমওপি সারের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩২৬ টন, ডিলাররা উত্তোলন করেছেন ৬৪৪ টন।
তবে মাঠের চিত্র আর বাজার বলছে ভিন্ন কথা। মোটা দাগে কৃষকদের অভিযোগ, সার সংকট আর দাম বেশি। জেলার একাধিক উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এমন চিত্র। সদর উপজেলার যতিনের হাট এলাকার আব্দুল আলীম এবার দুই একর জমিতে আমন আবাদ করেছেন। এক বুক হতাশা নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘খালি শুনি সার আছে, সার আছে। কিন্তু আমরা তো সার পাই না। কাইল সার আনছি কেজিতে ৫ টাকা বেশি দিয়া।’
বিরক্তি নিয়ে এই প্রতিবেদকের সামনে হাজির হলেন আরেক কৃষক সাচ্চু মিয়া। তার ভাষ্য, ‘সরকারি অফিসের লোক তো কইবে সার আছে। কিন্তু আমরা তো সার পাই না। পাইলেও দাম বেশি, গরিবের মরণ খালি।’
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে। তার দাবি, অন্যান্য বছরের তুলনায় জেলায় এবার সারের বরাদ্দ বেশি। এরই মধ্যে ডিলাররা সেপ্টেম্বর মাসের সার উত্তোলন শুরু করেছেন। জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। বললেন, ‘১৫ সেপ্টেম্বরের পর কৃষকের কিন্তু আর সার লাগবে না। আমরা নিয়মিত তদারকি করছি, যাতে কৃষক সার পায়।’ তার দাবি, অনেক কৃষক আলু আর ভুট্টা চাষের জন্য আগাম সার সংগ্রহ করছেন। এজন্য বাজারে কিছুটা অস্থিরতা বিরাজ করছে।
উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে বলছিলেন, ‘অক্টোবর মাসের জন্য পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ আছে। এ নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই।’ তিনি কৃষকদের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু সার কেনার আহ্বান জানান।





