‘অল্প বয়সে মেয়েটা বিধবা হলো, সংসার চলবে কীভাবে’

নিহতের স্বজনের আহাজারি, ছবি : আগামীর সময়
‘অল্প বয়সে মেয়েটা বিধবা হলো। এখন সে ছেলেকে নিয়ে কী করবে?’—ময়মনসিংহের আকুয়া বাইপাস এলাকায় বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে একই পরিবারের চারজনসহ সাতজন নিহত হওয়ার পর এমনই আহাজারি করছিলেন নিহত মোফাজ্জল হোসেন লেবুর শাশুড়ি রহিমা বেগম (৭০)।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার যা লাগত, সবই জামাই দিত। এখন আমার মেয়েটা কীভাবে চলবে, নাতিটাকে কীভাবে মানুষ করবে—জানি না।’
শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহের আকুয়া বাইপাস এলাকায় জামালপুরগামী রাজীব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন।
নিহতদের মধ্যে জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া এলাকার মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫৫), তার মা রশিদা বেগম (৮০), মেয়ে মর্জিনা বেগম (২৫) ও নাতি মোজাব্বিদ ইসলাম মিনান (৫) রয়েছেন। এ ছাড়া সিএনজিচালক সুজন মিয়া এবং নান্দিনা বাদে চান্দি এলাকার আকরাম আলী (৪৮) ও তার স্ত্রী মমতাজ বেগম নিহত হন।
পরিবারের স্বজনেরা জানান, মর্জিনা বেগম গর্ভবতী ছিলেন। মোফাজ্জল গাজীপুরের হোতাপাড়ায় টাইলসের কাজের ঠিকাদারি করতেন। তার স্ত্রী ও এক সন্তানও সেখানে থাকেন। নিয়মিত জামালপুরের বাড়িতে এসে তিনি মা, মেয়ে ও নাতির সঙ্গে দেখা করতেন।
স্বজনেরা জানান, মা রশিদা, মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিনানকে কয়েক দিনের জন্য গাজীপুরে নিজের বাসায় নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন মোফাজ্জল। শুক্রবার সকালে খাওয়াদাওয়া শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা বাড়ি থেকে বের হন। পরে নান্দিনা বাজারের সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা দেন।
দুপুর সোয়া ১টার দিকে আকুয়া বাইপাস এলাকায় পৌঁছালে জামালপুরগামী রাজীব পরিবহনের বাসটির সঙ্গে সিএনজিটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই চালকসহ এর সব যাত্রী নিহত হন।
নিহত মোফাজ্জলের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ইসমত আরা বলেন, ‘সকালেই আমার ভাসুর মোফাজ্জল, শাশুড়ি রশিদা, মর্জিনা ও মিনান গাজীপুরে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন। দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশের মাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর পাই। এরপর আমার স্বামী ময়মনসিংহে যায়।’
মোফাজ্জলের ফুফু জহুরা বেওয়া বলেন, ‘ছবি তুলে কী হবে? আপনারা কি একজনকে ফেরত দিতে পারবেন? এখন এই সংসার কে চালাবে, তাদের দায়িত্ব কে নেবে?’
পরিবারের স্বজনেরা জানান, মোফাজ্জল দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরে কাজ করতেন। তার আয়েই সংসার চলত। দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুতে পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জামালপুর-ময়মনসিংহ সড়কে রাজীব পরিবহনের বাস চলাচল বন্ধ এবং দুর্ঘটনার কারণ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, এর আগেও এ পরিবহনের বাস দুর্ঘটনায় পড়েছে। সড়কে বাস চলাচল ও দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
দুর্ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় ছাত্র-জনতা জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।




