অনেক ‘রোগে’ ভুগছে হাসপাতাল
- অচল হয়ে পড়ছে দামি যন্ত্রপাতি
- ভেতরে-বাইরে দালালের দৌরাত্ম্য
- নিরাপত্তার অভাবে ঘটছে চুরি
- জনবল সংকটে নিম্নগামী সেবার মান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল টঙ্গীর লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল। শুধু টঙ্গী নয়, রাজধানীর উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান এমনকি খিলক্ষেত থেকেও এখানে চিকিৎসা নেন অনেকে। বিশেষ করে টঙ্গীর তুরাগতীরে বিশ্ব ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের চিকিৎসাসেবায় বিশেষ ভূমিকা রাখে হাসপাতালটি। ফলে টঙ্গী ও এর আশপাশের মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এ হাসপাতালের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়ন থাকলেও নিরাপত্তাহীনতা, জনবল সংকট, অচল চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এবং সেবার মান নিয়ে নানা অভিযোগে জর্জরিত হাসপাতালটি। ফলে প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, ২০০০ সালে ৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। নাম রাখা হয় শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু শয্যা ও ভবন বাড়লেও সেবার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালটিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। এর প্রধান ফটক, জরুরি বিভাগ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী বা আনসার সদস্য। এ কারণে রোগী ও স্বজনদের মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। এমনকি হাসপাতালের বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী, দরজা-জানালাসহ অন্যান্য মালামাল চুরির ঘটনাও ঘটছে।
সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের উত্তর পাশের পুরনো ভবনের নিচতলায় চলছে জরুরি বিভাগ। সেখানে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। ভবনের দোতলায় পুরনো আসবাব স্তূপ করে রাখা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় গোডাউন। ওই ভবনের পাশেই হাসপাতালের বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট টিনশেড। সেখান থেকে নিয়মিত বর্জ্য না নেওয়ায় সৃষ্টি হয় দুর্গন্ধ। এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। বর্জ্য ফেলার জায়গার পাশেই আছে হাসপাতালের একটি পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ ভবন। সেটির ছাদে আড্ডা বসতে দেখা যায় ভাসমান মাদকসেবীদের। হাসপাতালের প্রধান ফটকের ডান পাশে আরেকটি পরিত্যক্ত ভবনে মলমূত্র ত্যাগ করেন পথচারী ও ভ্রাম্যমাণ মানুষ। এতেও নষ্ট হচ্ছে হাসপাতালের পরিবেশ। এ ছাড়া দশতলার নতুন ভবনের নিচতলার পরীক্ষাগার দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। ভবনে দুটি লিফট থাকলেও সেগুলো চালানোর জন্য নেই প্রয়োজনীয় জনবল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য করা বেশ কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি অকেজো পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে রোগীদের রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করাতে হচ্ছে হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের ভেতরেই অবস্থান করেন বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধি। তারা রোগীদের নিয়ে যান বাইরে। এতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে তাদের। জরুরি বিভাগের এক রোগীর স্বজনের দাবি, ‘হাসপাতালে পরীক্ষা করার সুবিধা না থাকায় বাধ্য হয়ে বাইরে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে।’
ঢাকার বাড্ডা এলাকার টেইলার্স ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ জানালেন নিজের অজ্ঞতার কথা, ‘অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে আব্দুল্লাহপুরে অচেতন হয়ে পড়েছিলাম। সেসময় স্থানীয়রা আমাকে নিয়ে যান এই হাসপাতালে। সেখানে ছিলাম প্রায় দুই ঘণ্টা। এর মধ্যে শুধু প্রেশার ও অক্সিজেন লেভেল পরীক্ষা করেন তারা। এরপর আমার স্বজনদের জানান, আমাকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে। সেখানে চিকিৎসা দেওয়ার মতো তাদের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।’
পুবাইল থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ইয়াসিন আরাফাতের অভিযোগ, ‘প্রথমে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ১০ টাকার টিকিট কিনতে হয়েছে। পরে ডাক্তার দেখানোর জন্য সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে জানতে পারি, তিনি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে আছেন। পরে এসে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রোগের কথা না শুনেই কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায়নি।’
এদিকে হাসপাতাল জুড়ে সক্রিয় দালাল চক্র নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের নামে রোগীদের বাইরে নিয়ে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আছে। এ ছাড়া হাসপাতালের সেবার মান ও কিছু চিকিৎসকের ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। স্থানীয় মো. ইফতেখার হোসেন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে হাসপাতালের এক সহকারী পরিচালকের নেমপ্লেটের ছবি প্রকাশ করে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ তোলেন। তার ওই পোস্টে অনেকে হাসপাতালের কিছু চিকিৎসকের আচরণ নিয়ে তুলে ধরেন নেতিবাচক অভিজ্ঞতা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে অসন্তোষের বিষয়টি।
এদিকে অনুমোদিত পদের বিপরীতে অনেক পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালের চিকিৎসাকাজ ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও সহায়ক কর্মচারীর অভাবে দুর্ভোগ বাড়ছে রোগীদের। অন্যদিকে অনেক সময় হাসপাতালের ফার্মেসিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগীদের জন্য বাড়তি বোঝা।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আফজালুর রহমানের ভাষ্য, ‘জনবল ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতাল চত্বর থেকে অবৈধ অটোরিকশা সরাতে বারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।’




