নেত্রকোনা
৫৩২ বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী শেখ বাড়ি মসজিদ

সংগৃহীত ছবি
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌর শহরের দক্ষিণ দৌলতপুর এলাকায় সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত শত বছরের পুরনো এক স্থাপনা—শেখ বাড়ি জামে মসজিদ। পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ আজও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
বাংলার স্বাধীন সুলতানদের অন্যতম শাসক আলাউদ্দিন হোসেন শাহ-এর শাসনামলে। ১৪৯৪ থেকে ১৫১৯ সালের মধ্যে নির্মিত হয় এই প্রাচীন মসজিদ। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শেখ বাড়ির তৃতীয় পুরুষ শেখ মনুর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মসজিদটি। সেই সময় পুরো এলাকায় এটিই ছিল একমাত্র মসজিদ।
তখনকার দিনে আশপাশে বসতি কম ছিল। দূর-দূরান্তের মানুষ নৌকায় করে এসে এখানে নামাজ আদায় করতেন। ছোট এই মসজিদে একসঙ্গে ২০ থেকে ৩০ জন মুসল্লি নামাজ পড়তে পারতেন।
মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে পুরনো ইট দিয়ে তৈরি একটি কবরস্থান। তবে সেখানে ঠিক কোন পূর্বপুরুষদের সমাহিত করা হয়েছে, তা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। সময়ের সঙ্গে অনেক স্মৃতিই হারিয়ে গেছে। পরে অবশ্য কবরস্থানটি সংস্কার করা হয়। বর্তমানে সেখানে শেখ বাড়ির পূর্বপুরুষদের কবরের পাশাপাশি রয়েছে দেশের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের মা আয়শা ফয়েজের কবরও।
স্থানীয়দের কাছে শেখ বাড়ি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, বরং স্মৃতিরও অংশ। কারণ শেখ বাড়িই ছিল হুমায়ূন আহমেদের নানার বাড়ি। ফলে এই মসজিদ ও আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার শৈশবের স্মৃতিও।
বর্তমান মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ৩৫ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রস্থও ৩৫ ফুট। দেয়ালগুলো ইটের তৈরি। রয়েছে দুটি দরজা এবং পাশে একটি ওজুখানা।
স্থানীয় বাসিন্দা সারোয়ার শেখ জানিয়েছেন, তাদের প্রথম পূর্বপুরুষ শেখ চাঁন পারস্য থেকে এসেছিলেন। শেখ চাঁনের ছেলে শেখ ফিরোজ এবং তার ছেলে শেখ মনু এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি বলেছেন, ‘সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে শেখ মনু এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তখন এটি ছিল পুরো এলাকার একমাত্র মসজিদ।’
কালের বিবর্তনে প্রাচীন এই মসজিদ একসময় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ২০১২ সালে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করা হলেও আগের সেই ঐতিহাসিক অবকাঠামো আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
মসজিদের কোষাধ্যক্ষ আলাউদ্দিন বিশ্বাস জানান, তিনি ১৯৮৭ সাল থেকে এই মসজিদে নামাজ আদায় করছেন। তার ভাষ্য, আগে এখানে একটি গম্বুজ ছিল। মসজিদটি ছোট ছিল, অল্প মানুষ নামাজ পড়তে পারত। পরে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে টিনের ঘর করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
বর্তমানে শেখ বাড়ি জামে মসজিদে ইমামতি করছেন মুফতি আবু দারদা। বললেন, ‘আমি আট বছর ধরে এখানে ইমামতি করছি। এই মসজিদের পরিবেশ খুবই মনোরম। মুসল্লিরাও অনেক শান্ত ও ভদ্র।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুন্নবী শেখ বলেছেন, ‘তখন আশপাশে কোনো মসজিদ ছিল না। চার থেকে পাঁচ মাইল দূর থেকেও মানুষ নৌকায় করে এখানে নামাজ পড়তে আসত। আমরা পুরনো অবকাঠামো পেয়েছিলাম, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো— সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি ধরে রাখতে পারিনি।’
বাংলার ইতিহাসে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলকে ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। তিনি ১৪৯৪ থেকে ১৫১৯ সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। দক্ষ প্রশাসক হিসেবে তিনি যেমন পরিচিত ছিলেন, তেমনি শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল। তার আমলে বাংলা সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটে এবং নির্মিত হয় বহু মসজিদ, স্থাপনা ও জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো।
শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোহনগঞ্জের শেখবাড়ি মসজিদ। সময় বদলেছে, পাল্টেছে স্থাপত্য, হারিয়ে গেছে অনেক স্মৃতি। তবু ইতিহাস আর ঐতিহ্যের আলো ছড়িয়ে এখনো মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে আছে পাঁচ শতাব্দী পুরনো এই মসজিদ।




