ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ
অপরাধীদের দখলে রেলস্টেশন
- ২০১৮ সালে নির্মিত
- ব্যয় পৌনে ২ হাজার কোটি
- চুরি হচ্ছে লাখ টাকার সরঞ্জাম
- সন্ধ্যায় মাদকের আখড়া
- নিরাপত্তাহীনতায় যাত্রী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা

আধুনিক ভবনে সজ্জিত পাবনা রেলওয়ে স্টেশন। ২০১৮ সালে সেখানে প্রায় পৌনে ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ। আপাতদৃষ্টিতে সুন্দর এই স্টেশনের গভীরে ক্ষত আর ক্ষত। জনবল সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে স্টেশনের লাখ টাকার সম্পদ। চুরি হচ্ছে বৈদ্যুতিক তার, ফ্যান ও জানালার সরঞ্জাম। সন্ধ্যা নামলেই স্টেশন চত্বরে বসে মাদক ও অসামাজিক কাজের আসর। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় যাত্রী ও রেলকর্মীরা।
পাবনাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করে চালু হয় এই রেলপথ। প্রকল্পের আওতায় পাবনা স্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য করা হয় দুটি সুসজ্জিত অফিসার্স কোয়ার্টার, প্ল্যাটফর্মের পাশে পাঁচ কক্ষের তিনটি অফিস ভবন। উদ্বোধনের আট বছর পেরিয়ে গেলেও আজও অব্যবহৃত পড়ে আছে সেসব ভবন।
সরেজমিনে যান প্রতিবেদক। দেখেন, ভুতুড়ে রূপ নিয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ভবনগুলো। ব্যবহারের আগেই নষ্ট হচ্ছে দরজা-জানালা, খসে পড়ছে পলেস্তারা। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও ভবনগুলোর থাই অ্যালুমিনিয়াম, লোহার দরজা, ফ্যান এবং দামি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। এমনকি খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পানি সরবরাহের জন্য বসানো সাবমারসিবল পাম্প ও টিউবওয়েলের যন্ত্রাংশ। বর্তমানে স্টেশনে নেই সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা। স্টেশনের বাতিগুলো নষ্ট থাকায় রাতে দেখা দেয় ঘুটঘুটে অন্ধকার।
পুরো এলাকা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। স্টেশনের যাত্রী মাসুদা বেগমের ক্ষোভ, ‘হাজার কোটি টাকা খরচ করে রেললাইন হলো। কিন্তু স্টেশনের এই দশা কেন? বাতি নেই, নিরাপত্তাও নেই। রাতে এখানে আসতে ভয় লাগে।’
দিনদুপুরে যেখানে সাধারণ যাত্রীদের বসার কথা, সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বখাটের দল। আর সূর্য ডুবলেই পুরো স্টেশন ডুবে যায় অন্ধকারে। দেখা যায় মাদক আর অসামাজিক কার্যকলাপের দৌরাত্ম্য। স্টে শনের বুকিং কাউন্টার থেকে শুরু করে শৌচাগার— সব জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও পরিত্যক্ত সামগ্রী।
স্থানীয় আজাহার আলী বিশ্বাসের দাবি, ‘দিনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আড্ডা আর রাতে মাদকসেবীদের দখলে থাকে স্টেশনটি। প্রকাশ্যে মাদক সেবনের কারণে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।’
স্টেশনের আশপাশে থাকা স্থানীয় তরিকুল, মোস্তফা ও মারুফের জিজ্ঞাসা, ‘এখানে লাখ লাখ টাকায় বড় বেশ কয়েকটি কোয়ার্টার ও অফিস ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো কী কাজে নির্মাণ করা হয়েছে, তা স্টেশনের কেউ জানেন না। কখনো এগুলো ব্যবহার হতে দেখিনি। এরই মধ্যে ভবনগুলোর রুমের মূল্যবান জিনিসপত্র সব চুরি হয়ে গেছে। ছিনতাই ও জিম্মি করার মতো ঘটনাও ঘটছে।’
পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভাগীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানা যায়, রাজশাহী থেকে ঢালারচর রেলপথটি চালু হয় ২০২০ সালে। পৌনে ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রেলপথ দিয়ে সারা দিনে চলে একটি ট্রেন। গত চার বছরে ট্রেনটি চালাতে গিয়ে যে অর্থ খরচ হয়েছে, তার অর্ধেকও ওঠেনি যাত্রী পরিবহন করে। একাধিক ট্রেন চললে পথটি লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু নতুন ট্রেন দেওয়ার সামর্থ্য নেই রেলের। অথচ ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত নতুন লাইন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকার বেশি।
নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে স্টেশনমাস্টারের দায়িত্বে থাকা মিরাজুল ইসলাম বললেন, ‘এত বড় স্টেশনের নিরাপত্তার জন্য মাত্র দুজন কর্মী আছেন। আমি বুকিং সহকারী হয়েও মাস্টারের দায়িত্ব পালন করছি। পোর্টারদের দিয়ে বুকিংয়ের কাজ করাতে হচ্ছে। মাদকসেবী ও চোরদের উৎপাত এতই বেশি যে, আমরা নিজেরাও সবসময় তটস্থ থাকি। স্থানীয় পুলিশকে জানিয়েও তেমন প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।’
এ বিষয়ে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) লিয়াকত শরীফ খান জানালেন, পাবনা রেলস্টেশনে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়লে কাজের পরিধি বাড়বে এবং জনবল সংকটও কেটে যাবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় তিনি স্থানীয় সচেতন মহলের সহযোগিতাও কামনা করেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের বক্তব্য, ‘জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান। প্রয়োজনীয়সংখ্যক জনবল পেলে ঈশ্বরদী-ঢালারচর রুটে নিয়োগ দিতে পারব।’




