প্রবীণ নেই প্রবীণ নিবাসে, তালাবদ্ধ ৭ কোটির ভবন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রবীণদের শেষ বয়সে একটু শান্তি দেওয়ার কথা ছিল ‘শান্তি নিবাসে’। কিন্তু সুনামগঞ্জে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২৫ শয্যার সেই নিবাসে তিন বছরেও ওঠেননি একজন প্রবীণ। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় হাছন নগরের ভবনটি পড়ে আছে তালাবদ্ধ। ভেতরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে চেয়ার-টেবিল, ব্যায়ামের সরঞ্জাম ও চিকিৎসাসামগ্রী। কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা, মেঝেতে পড়ে আছে ইঁদুরের কঙ্কাল। প্রায় সব কক্ষেই ছড়িয়ে আছে ইঁদুরের মল ও আবর্জনা। দেয়ালে জমেছে শ্যাওলা।
স্থানীয়রা বলছেন, সুনামগঞ্জে এখনো এমন অনেক প্রবীণ রয়েছেন, যাদের শেষ বয়সে থাকার মতো নিরাপদ জায়গা নেই। তাদের কেউ আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভরশীল, আবার কেউ দিন কাটান অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাদের জন্য নির্মিত আবাসনটি চালু না হওয়ায় উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্বম্ভরপুর দিগেন্দ্র বর্মন সরকারি কলেজের প্রভাষক সবিতা বীর মনে করেন, সমাজের আশ্রয়হীন প্রবীণদের জন্য শান্তি নিবাসটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি চালু না হওয়া দুঃখজনক। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবলের পদ সৃষ্টি করে এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
সিলেট বিভাগের একমাত্র এই শান্তি নিবাসের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয় ২০২২ সালে। ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ধীরগতির কারণে পুরো কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ২৫ শয্যাবিশিষ্ট শান্তি নিবাসে ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৯৬ লাখ ৫৩ হাজার ৯৪৪ টাকা। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও আবাসনটি চালু হয়নি।
তবে সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় জনবলের পদ সৃজন না হওয়াই প্রতিষ্ঠানটি চালু না হওয়ার মূল কারণ। সুনামগঞ্জ সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক নিবাস রঞ্জন দাশ বললেন, ‘ভবন নির্মাণের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। একজন প্রকল্প পরিচালকের তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হলেও প্রয়োজনীয় পদ সৃজন না হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
প্রবীণদের শেষ বয়সে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্মিত ভবনটি এখন নিজেই যেন আশ্রয়হীন। সামাজিক সংগঠনের কর্তারা মনে করেন, দ্রুত জনবল নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটি চালু না করা হলে একদিকে যেমন নষ্ট হবে কোটি টাকার অবকাঠামো ও সরঞ্জাম, অন্যদিকে বঞ্চিত থাকবেন সেই মানুষগুলো, যাদের জন্য শান্তি নিবাসটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরী ভট্টাচার্য্য বলেছেন, ‘শিশু পরিবারের ভেতরে শান্তি নিবাস স্থাপনের উদ্যোগটি ছিল মানবিক ও সময়োপযোগী। তার মতে, শিশুদের পারিবারিক পরিবেশ এবং প্রবীণদের নিরাপত্তা— দুই দিক থেকেই প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এটি চালু হলে শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।’
সামাজিক সংগঠন সুনামগঞ্জ জনউদ্যোগের আহ্বায়ক সুখেন্দু সেনের ভাষায়, সুনামগঞ্জে শান্তি নিবাসের ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। বয়স্ক, পরিত্যক্ত ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও মানবিক একটি উদ্যোগ। এখানে চিকিৎসা, ব্যায়ামসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এত সুন্দর একটি প্রতিষ্ঠান এখনো চালু করা যাচ্ছে না। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবন ও কেনা যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। সরকারি এই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া এবং দ্রুত শান্তি নিবাস চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
একই দাবি বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান চৌধুরীর। তিনি বলেছেন, ‘সরকারি শিশু পরিবারের ভেতরে পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কার্যক্রম শুরু হয়নি। তার ভাষ্য, এটি চালু হলে অবহেলিত ও আশ্রয়হীন প্রবীণরা নিরাপদ আশ্রয় পাবেন।’
শান্তি নিবাসটি সরকারি শিশু পরিবারের ভেতরে নির্মাণের পেছনে ছিল একটি মানবিক ভাবনা। অনাথ ও অসহায় শিশুদের সঙ্গে প্রবীণদের সহাবস্থান তৈরি করে পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলার কথা ছিল। এতে আশ্রয়হীন প্রবীণরা যেমন নিরাপদ আবাসন পেতেন, তেমনি শিশুদেরও বয়স্ক মানুষের স্নেহ, মমতা ও সাহচর্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো— মনে করেন স্থানীয়রা।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খানের ভাষ্য, প্রবীণদের সেবার জন্য ভবনটি নির্মাণ করা হলেও সেখানে এখনো জনবল নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া হয়েছে।




