শিশুকে নির্যাতন ‘পারিবারিক বিষয়’, ভিডিও করলেও অভিযোগ নেই মায়ের

শিশুটিকে নির্যাতনের ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি (বাঁয়ে), অভিযুক্ত লতার স্বামী ও বাবাকে নেওয়া হচ্ছে থানায় (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত
নরসিংদীর মাধবদীতে তিন মাসের শিশুর পা মুচড়ে নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে দেখে ক্ষুব্ধ অনেকে। ঘটনার বিচার ও কঠোর সাজা চাইছেন তারা। শিশুটিকে নির্যাতনে অভিযুক্ত চাচি পলাতক। তার স্বামী ও বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মামলাটি পরিবারের নয়, হয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে।
কারণ, সন্তানের ওপর হওয়া নির্যাতনের বিচার চান না তার মা-বাবা। পারিবারিকভাবে বিষয়টি মীমাংসিত জানিয়ে তাদের কথা, কোনো অভিযোগ নেই কারও বিরুদ্ধে। শিশুর কোনো ক্ষতি হয়নি বলেও দাবি তাদের। ফেসবুকে স্থানীয়ভাবে ধারণ করা কিছু ভিডিও সাক্ষাৎকারে শিশুর মা-বাবাকে এও বলতে শোনা গেছে- ভিডিওটি এআই জেনারেটেড।
শিশুর বাবা-মা হলেন মাধবদী উপজেলার পাইকারদী গ্রামের জহিরুল হক ও সাইফা বেগম। তিন মাসের ছেলেটি তাদের দ্বিতীয় সন্তান। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি নন তারা বা পরিবারটির অন্য কোনো সদস্য। তবে গতকাল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কথা বলেন তাদের সঙ্গে। ধারণ করেন কথোপকথনের ভিডিও।
তাতে সাইফা পুলিশকে জানাচ্ছিলেন, জন্মের পর থেকেই বেশ অসুস্থ শিশুটি। তিন মাস বয়সের প্রথম দুই মাসই ভর্তি ছিল হাসপাতালে। যেতে হয়েছিল এনআইসিইউ পর্যন্তও। মাসখানেক হলো সন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ফিরেছেন তিনি। বাচ্চার দেখাশোনায় বাড়তি নজর দিতে হয় বলে সাংসারিক কাজে সময় দিতে পারেন না এই গৃহবধূ। এ নিয়েই ভাসুরের স্ত্রী লতা বেগম ছিলেন ক্ষুব্ধ।
‘তেমন কিছু না। অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে তো আমি ঘরের কাজ করতে পারতাম না। এসব নিয়েই উনার (লতা) সঙ্গে একটু কথা-কাটাকাটি হয়। সব ঘরেই যেমন হয়, তেমনই। তাই উনি (লতা) আমার বাচ্চাকে একটু পায়ে চাপ দিয়েছিল। তবে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি।’
ভিডিওর বিষয়ে সাইফর ভাষ্য, তিনি রুমে না থাকলে বাচ্চা প্রায়ই কান্না করত। বাচ্চার সঙ্গে কী ঘটছে- জানতেই মোবাইল ফোনে ভিডিও চালু করে ঘর থেকে বের হন। তাতেই ধরা পড়ে লতার নির্যাতনের ঘটনা। ভিডিওতে দেখা যায়, লতা ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত শিশুর একটি পা জোরে মুচড়ে দিয়েই দ্রুত বের হয়ে যান। সাইফা জানালেন ঘটনাটি গত ১১ জুলাইয়ের।
এরপর কী হলো? জহিরুল হকের ভাষ্য, ঘটনাটি জানানো হয় লতার পরিবারকে। তার বাবা আলমাছ মিয়া আসেন মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে। জহিরুল ও সাইফার কাছে মেয়ের এমন কাণ্ডের জন্য ক্ষমাও চান। এভাবেই বিষয়টি মিটমাট হয়।
ভিডিও ফেসবুকে কীভাবে গেল তা জানা নেই বলে দাবি জহিরুল-সাইফা দম্পতির। এ সময় পাশ থেকে পরিবারটির এক সদস্য বলে উঠলেন, রিজিকের হাসপাতালে চিকিৎসার সব খরচ জুগিয়েছেন লতার স্বামী ও জহিরুলের বড় ভাই কাউছার আহমেদ।
জহিরুল তখন বলে ওঠেন, ‘আমার ছেলের তো কোনো ক্ষতি হয়নি। আমরা তো এরপর আর ডাক্তারও দেখাইনি। পা ভাঙলে তো বাচ্চা অনেক কান্নাকাটি করত। এখন ভিডিও ফেসবুকে যাওয়ায় এত কথা হচ্ছে।’
ভিডিওটি প্রথম ফেসবুকে পোস্ট হয় স্থানীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ নুর আলমের ফেসবুক আইডি থেকে। তিনি আগামীর সময়কে জানালেন, একান্নবর্তী পরিবারটির খরচ চলে জহিরুলের বড় ভাই কাউছারের স্যানিটারির দোকান থেকে। জহিরুল মাঝে মাঝে সেটি দেখভালে যান। দুই ভাই, তাদের স্ত্রী-সন্তান ও বাবা-মা মিলে এই বড় সংসার।
নুর বললেন, ‘বাচ্চার মা কিছুটা পারিবারিক চাপেই পড়েছেন। তিনি তো বাচ্চার কথা ভেবেই লতাকে ধরার জন্য ভিডিও করেছিলেন। পরে লতার স্বামী ও বাবা তার কাছে ক্ষমা চান। মেয়েকে কিছুদিনের জন্য বাড়ি নিয়ে যান লতার বাবা। সেখান থেকেই পালিয়েছেন লতা।’
ভিডিওটি কীভাবে পেলেন? নুরের জবাব- ‘আমাকে পরিচিতজন এটা পাঠিয়েছেন। সাংবাদিকতার সূত্রে এমন অনেক তথ্য তো অনেকে পাঠায়। সেসব হাত ঘুরেই এসেছে। পরে আমি নিজে খোঁজ নিয়ে দেখলাম ভিডিওর ঘটনা সত্য। তাই ফেসবুকে পোস্ট দেই।’
নুরের ওই পোস্ট ভাইরাল হলে মাধবদী থানা পুলিশ যায় ঘটনাস্থলে।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বললেন, ‘বাচ্চাটা অনেকদিন হাসপাতালে ছিল। পরিবারের খরচ থেকেই শিশুটির চিকিৎসার সব খরচ দেওয়া হয়েছিল। আবার ছোট সন্তান নিয়ে বাচ্চার মা ঘরের কাজ করতে পারতেন না। এসব কারণে ওই নারী (লতা) এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। লতার স্বামী আর বাবাও বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বাচ্চার মায়ের মোবাইল থেকে ভিডিওটা পরে ডিলিট করানো হয়েছে।’
‘এটি নিঃসন্দেহে আইনের ভাষায় অফেন্স। তিন মাসের বাচ্চার সঙ্গে নির্মম আচরণ করা হয়েছে। কেবল ক্ষতি হয়নি বলে এটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা লতার বাবার বাড়িতে গিয়েও তাকে পাইনি। তার বাবা ও স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনি। শিশুর বাবা-মা অভিযোগ জানাতে রাজি ছিলেন না। তাই ডিসির পরামর্শে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন অফিসার রিজা আক্তার গতকাল রাতে মামলা করেন। তাতে ওই দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে’ - যোগ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
অভিযুক্ত লতাকে গ্রেপ্তারের পুলিশের অভিযান চলছে। গ্রেপ্তার দুইজনকে আদালতে তুলে রিমান্ডে চাওয়া হবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য শিশুটিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেয়া হবে। এসবও জানালেন ওসি কামাল হোসেন।







