পুলিশের গবেষণা
আশ্রয়কেন্দ্রে নির্যাতনের শিকার ৭৫ শতাংশ নারী-শিশু

ফাইল ছবি
দুর্যোগে স্থাপিত আশ্রয়কেন্দ্রেই নিপীড়নের শিকার হন ৭৫ শতাংশ নারী-শিশু। ভয়াবহ দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেও সক্রিয় হয়ে পড়ে দুবৃত্তরা। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেই ঘটে ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরিসহ নানা অপরাধ। পুলিশের গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এই চিত্র।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উদাসীনতা এবং মনিটরিংয়ের অভাবে ঘটে এমন ঘটনা। একইসঙ্গে দুর্যোগের বিশৃঙ্খলা, ত্রাণ বিতরণে অনিয়মও এসব ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
পুলিশের গবেষণায় বলা হয়েছে, উপকূলীয় দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশু। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মোট ভুক্তভোগীদের মধ্যে নারী ৫১ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং শিশু ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভুক্তভোগীই নারী ও শিশু।
গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন রাজশাহী রেঞ্জের সদ্য বিদায়ী উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, দুর্যোগের সময় এক শ্রেণীর অপরাধী সক্রিয় হয়ে উঠে। তবে এই সময়টাতে পুলিশসহ সবগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উচিত পর্যাপ্ত মনিটরিং নিশ্চিত করা। কারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যায়। কিন্তু সেখানে যদি নারী ও শিশু নিরাপদ না থাকে, তাহলে পুরো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। অনেক সময়ই দেখা যায় একই কক্ষে নারী, শিশু ও পুরুষের অবস্থান। সেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব থেকেই বেশির ভাগ যৌন হয়রানি ও কটূক্তির ঘটনা ঘটে।
৩৮৫ জন উত্তরদাতার মতামত এবং ১০ জন কী-ইনফরম্যান্টের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত গবেষণাটিতে উঠে এসেছে, দুর্যোগ শুধু ঘরবাড়ি ও সম্পদের ক্ষতি করে না। সামাজিক নিরাপত্তাকেও দুর্বল করে দেয়। এই সুযোগে বেড়ে যায় চুরি, দখল, ত্রাণে অনিয়ম, অবৈধ অর্থ আদায় এবং নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতার ঝুঁকি। ৫৯ দশমিক ২০ শতাংশ উত্তরদাতার মতে দুর্যোগের সময় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে বা বেড়ে যায়। আশ্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড়, আলাদা নিরাপদ জায়গার অভাব, অপর্যাপ্ত আলো, স্যানিটেশন সংকট এবং পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।
গবেষণায় ৯৮ দশমিক ৩২ শতাংশ উত্তরদাতা চুরির ঘটনা, ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রতিবেশীর সম্পদ দখল এবং ৬৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ অবৈধ অর্থ আদায়ের ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। দুর্যোগ শেষ হওয়ার পরও পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয় না। ত্রাণে অনিয়ম ও প্রতারণার ঘটনার কথা জানিয়েছেন ৯৮ দশমিক ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা। এছাড়া, চুরি ও ঝগড়া ৮৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ, ভূমি দখল ৫৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছেন ৪২ দশমিক ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা। এর বাইরে, দুর্যোগ-পরবর্তী সময়েও অপরাধীদের তৎপরতা অব্যাহত থাকে।
গবেষণায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও উঠে এসেছে মিশ্র চিত্র। ৬৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ উত্তরদাতা গ্রাম পুলিশের সেবায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। প্রায় ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ বলেছেন, অস্ত্রধারী ডাকাত দমনে পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। একই গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতাও। ৫৮ দশমিক ০৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, দুর্যোগের সময় তারা পুলিশের কোনো সহায়তা পাননি। ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ বলেছেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়নি। ৫৩ দশমিক ২৪ শতাংশ সেবার ক্ষেত্রে ঘুষ-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। আর ৩৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ পুলিশি হয়রানির অভিযোগও করেছেন।
গবেষকদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, নদীভাঙন, ফসলহানি, গবাদিপশুর ক্ষতি এবং জীবিকার সংকট দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে কিছু মানুষ অপরাধের পথেও জড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় আশ্রয়কেন্দ্রকে শুধু নিরাপদ ভবন হিসেবে নয়, নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ হিসেবেও গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে ৩ কোটি ১০ লাখ শিশু এমন এলাকায় বাস করে, যেখানে নদীর পানি বেড়ে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে। এই সংখ্যাটি মোট শিশুর অর্ধেকেরও বেশি। নদীর পানি বাড়লে তা শুধু ঘরবাড়ি কেড়ে নেয় না। কেড়ে নেয় স্কুলে যাওয়ার সুযোগ, বিশুদ্ধ পানি এবং শিশুর নিরাপত্তা।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, বন্যায় বিপদগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে অন্য সময়ের মতোই র্যাব সদস্যরা পাশে থাকছেন। দুর্যোগের সময় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে থাকা মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও খেয়াল রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সুপারিশ
গবেষণায় সুপারিশ করা হয়েছে, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও শিশুদের জন্য পৃথক নিরাপদ স্থান, পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ স্যানিটেশন, নারী স্বেচ্ছাসেবক, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পুলিশি টহল নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উদ্ধার কার্যক্রম, আশ্রয়কেন্দ্রের নিরাপত্তা, ত্রাণ ব্যবস্থাপনা এবং নারী-শিশু সুরক্ষায়ও পুলিশকে আরও সক্রিয় ও সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে। দুর্যোগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকা মানুষগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রাণ রক্ষার আশ্রয়কেন্দ্রও নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠবে না।




