শিশুদের ২৫ পয়সায় শুরু, এখন বই ১৫ হাজার

বাড়ীয়ালী যুব পাঠাগার
মাত্র ৩ টাকা ২৫ পয়সা আর ১৩ জন শিশু-কিশোরের স্বপ্ন দিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা। প্রায় পাঁচ দশক পর সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ ১৫ হাজার বইয়ের সমৃদ্ধ পাঠাগার। শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, এই পাঠাগার এখন পুরো এলাকার জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র।
৪৯ বছর আগে যশোরের চৌগাছা উপজেলার বাড়ীয়ালী গ্রামের একদল স্বপ্নবাজ শিশু-কিশোরের হাত ধরে শুরু হয় পাঠাগারটি। এটি ‘বাড়ীয়ালী যুব পাঠাগার’ নামে পরিচিত।
১৯৭৭ সালের ৩০ মে যাত্রা শুরু হয় পাঠাগারটির। তখন গ্রামাঞ্চলে বই পড়ার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। সেই অভাব থেকেই ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ১৩ জন শিশু-কিশোর উদ্যোগ নেয় একটি পাঠাগার গড়ে তোলার। উদ্বোধনের দিন প্রত্যেকে ২৫ পয়সা করে চাঁদা দেন। সেই ৩ টাকা ২৫ পয়সাই ছিল পাঠাগারের প্রথম মূলধন।
পাঠাগারটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশিষ্ট মুনশী মেহেরুল্লাহ গবেষক নাসির হেলাল স্মৃতিচারণ করে আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠার সময় আমি নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। আর অন্যরা তখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত। তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, রাস্তাঘাট ছিল কাদাময় এবং আশপাশের দুই গ্রামে ছিল না কোনো স্কুল-কলেজও। গ্রামের মানুষ যেন বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারে, সেই ভাবনা থেকেই আমাদের এই উদ্যোগ।’
তিনি আরও বললেন, ‘কখনো ভাবিনি ২৫ পয়সা করে চাঁদা তুলে শুরু হওয়া পাঠাগারটি একদিন এত বড় হবে। এখন দূর-দূরান্ত থেকে ছেলেমেয়েরা এখানে বই পড়তে আসে। তখন আমার গর্ব হয়।’
বর্তমানে বাড়ীয়ালী যুব পাঠাগারে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ধর্ম, আত্মজীবনী, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র, কর্মসংস্থানবিষয়ক বই এবং শিশুতোষ বইসহ রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার বই। পাঠাগারটি স্থানীয়দের জন্য হয়ে উঠেছে জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র।
স্থানীয় পাঠক নূরুল ইসলাম বললেন, ‘এটি আমাদের এলাকার জ্ঞানের ভাণ্ডার। বিশেষ করে ধর্মীয় ও সামাজিক নানা বিষয়ে এখানকার বই থেকে অনেক উপকার পাওয়া যায়। গ্রামের সাধারণ মানুষের পক্ষে বই কিনে পড়া সম্ভব হয় না। তাই পাঠাগারটি আমাদের জন্য আশীর্বাদের মতো।
পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ মন্টু আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, এটি যশোর গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের ০০১ নম্বর তালিকাভুক্ত এবং বাংলাদেশের ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত একটি পাঠাগার। কয়েক বছর আগে ঘূর্ণিঝড়ে আধাপাকা ভবনের ক্ষতির কারণে নষ্ট হয়ে যায় অনেক মূল্যবান বই। পরে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন পাকা ভবন। সেখানে রয়েছে একটি বড় পাঠকক্ষ ও একটি অফিস কক্ষ।
তিনি আরও জানালেন, বই বিতরণের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে পাঠাগারটি। প্রতিবছর মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করা হয় অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের।
হারুন অর রশিদ মন্টু জানালেন, পাঠাগারটি সবার জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত। এখানে বই পড়তে ফি বা চাঁদা দিতে হয় না কোনো সদস্যকে। প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে।
তবে আধুনিক সময়ে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তির কারণে আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে পাঠকের সংখ্যা। আগে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন পাঠক আসলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৩৫ জনে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও পিএইচডি গবেষকরাও নিয়মিত এই পাঠাগারে আসেন গবেষণার প্রয়োজনে।





