শরণখোলা
অবরোধের যাঁতাকলে জীবিকার লড়াই

ছবি: আগামীর সময়
‘বছরের প্রায় ছয় মাসই থাহে (থাকে) অবরোধ। জাল-নৌকা থাকলেও মাছ ধরতে যাইতে পারি না। মাছ না ধরলে আমাগো প্যাডে (পেটে) ভাত জোডে না। সংসার চালাইতে খুবই কষ্ট অয়! অবরোধের সময় ধার-দেনা কইর্যা, সুদে টাহা আইন্যা কোনোমতে জীবন বাঁচাই। অবরোধে সরকার আমাগো যে চাউল দেয়, তা দিয়া তো আর সারা বছর চলে না। আর খালি চউল তো খাওয়া যায় না, আরও তো কত কিছু লাগে। হেয়া (তা) তো আর সরকার দেয় না। মাছ ধরা বন্ধ ওইলে আমাগো কষ্টের আর শ্যাষ থাহে না। জাইল্যা কাড থাহার পরও ৫৮ দিনের অবরোধে আমারে কোনো চাউলই দেয় নাই। পরিষদে গ্যালে কয় তালিকায় তোমার নাম ওডে (ওঠে) নাই। এরম ওইলে আমরা ক্যামনে বাঁচি কন?’
এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে জীবন সংগ্রামের এই কথাগুলো বললেন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার জীবনদুয়ারী গ্রামের হতদরিদ্র জেলে আলামিন খান (৫২)।
মাছ ধরা বন্ধ, তাই অন্যের বাড়ি দিনমজুরি খেটে কোনোমতে সংসার চলছে তার। একইভাবে উপকূলের হাজারো হতদরিদ্র জেলে পরিবারে চলছে হাহাকার। তাদের ঘর থেকে যেন ভেসে আসছে বোবা কান্নার শব্দ। মৎস্য আহরণে একের পর এক নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে জেলেদের জীবন। তবুও চলছে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত এই পেশায় তাদের টিকে থাকার অবিরাম লড়াই।
বঙ্গোপসাগর, সুন্দরবন আর স্থানীয় নদ-নদী ঘিরেই স্বপ্ন দেখা-বেঁচে থাকা উপকূলের হাজারো জেলে পরিবারের। বংশ পরম্পরায় মাছ ধরাই তাদের পেশা এবং একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু সেই মাছ ধরায় একের পর এক সরকারি নিষেধাজ্ঞা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দস্যু আতঙ্ক, ঋণের বোঝা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে সাধারণ জেলেদের জীবন।
বছরের প্রায় অর্ধেক সময় নদী-সাগর ও সুন্দরবেন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়ছেন জেলেরা। উপার্জন না থাকায় ঠিক মতো চলছে না সংসার। অসুখ-বিসুখ হলে তার হয় না সঠিক চিকিৎসাও। অভাবে পড়ে লেখাাপড়া বাদ দিয়ে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছে জেলে পরিবারের ৮-১০ বছরের শিশুরা। এমনকি এসব শিশুরা তাদের বাবার সঙ্গে যাচ্ছে মাছ ধরতেও। নদীর পাড়ে গেলে দেখা যায় শত শত শিশু নদীতে চিংড়ি রেণু পোনা আহরণ করছে। অভাবের তাড়নায় স্কুল বাদ দিয়ে তারা কেউ বাবার সঙ্গে আবার অনেকে একা একাই নেট টানছে নদীতে। এতে শিশুরা একদিকে পড়ছে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে, অন্যদিকে অকালে ঝরে পড়ছে তাদের শৈশব ও শিক্ষাজীবন। ফলে উপকূলজুড়ে জেলে পরিবারগুলোতে ধীরে ধীরে নেমে আসছে নীরব মানবিক বিপর্যয়। এ ছাড়া ঠিকমতো মাছ ধরতে না পারায় লোকসানে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন মৎস্য ব্যবসায়ীরাও।
বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক মাছের নিরাপদ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য আহরণে চলছে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এটি শুরু হয়েছে ১৫ এপ্রিল এবং শেষ হবে ১১ জুন। একই সঙ্গে চলছে জাটকা আহরণেও ৮ মাসের (১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন) নিষিদ্ধকাল। এই দুই নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার আগেই জেলেদের জন্য আসছে আরো একটি বড় দুঃসংবাদ। সেটি হলো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রজননের মৌসুম। এ জন্য ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস মাছসহ সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণ এবং পর্যটক প্রবেশ বন্ধ থাকবে সুন্দরবনে। এ সময় বেকার হয়ে পড়বেন হাজার হাজার জেলে। সামুদ্রিক বা স্থানীয় জেলেরা নিষিদ্ধ সময় সরকারি কিছু সহায়তা পেলেও সুন্দরবনের জেলেদের দেওয়া হয় না কোনো সুবিধাই।
ফলে এই নিষিদ্ধ সময়ে চরম খাদ্য ও আর্থিক সংকটে পড়েন বননির্ভর জেলেরা। এসব পরিবারে নেমে আসে হতাশার অন্ধকার। এ ছাড়া সামনে আসছে মা ইলিশ সংরক্ষণ ও ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সমুদ্র ও স্থানীয় নদ-নদীতে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। সব মিলিয়ে বছরের প্রায় অর্ধেক সময়ই নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে থমকে থাকে জেলেদের জীবন। নিষিদ্ধকালীন নিবন্ধিত জেলেদের সরকার যে পরিমাণ খাদ্য সহায়তা দেয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আবার প্রকৃত জেলেদের বড় একটি অংশ রয়েছে সরকারি তালিকার বাইরে।
স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে প্রকৃত জেলেদের পরিবর্তে সরকারি তালিকায় স্থান পেয়েছে অন্য পেশার মানুষ। এমন অভিযোগ করেছেন বাদ পড়া প্রকৃত জেলেরা। সম্প্রতি রায়েন্দা ইউনিয়নের চাল বিতণের সময় প্রকৃত জেলেদের নাম বাদ পড়ায় তারা বিক্ষোভ করেছেন পরিষদ চত্বরেই।
শরণখোলার রাজৈর গ্রামের জেলে জামাল হোসেনের (৪২) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্যের ট্রলারে জেলে শ্রমিক হিসেবে সাগরে মাছ ধরেন তিনি। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন মাছ ধরা বন্ধ। বন্ধ আয়ের পথও। সংসারে সদস্য সংখ্যা ৬। উপার্জনের মানুষও তিনি একা। তাই মহাজনের ট্রলারের জাল মেরামত করছেন। একদিন জাল মেরামত করলে পান ৬০০ টাকা। তা দিয়েই কোনোমতে চলছে সংসার। তার নাম নেই খাদ্য সহায়তার তালিকায়।
পূর্ব রাজৈর গ্রামের জেলে জাহাঙ্গীর শিকদার (৬০) দিলেন তাদের পরিবারে ঘটে যাওয়া দুর্বিষহ এক ঘটনার বর্ণনা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাস। তার চার ছেলের মধ্যে বড় ছেলে নাইমুল হাফিজ সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন অন্যের ট্রলারে। ট্রলারে তার ছেলেসহ ছিলেন ১৬ জন জেলে। কিন্তু এর পর তার ছেলেসহ ১৬ জেলে এবং ট্রলারের আর সন্ধান মেলেনি আজও। হয়তো ট্রলার ডুবে হারিয়ে গেছে ১৬টি প্রাণ। নিখোঁজ ছেলের স্মৃতি হাতড়ে এখনো নীরবে কাঁদেন হতভাগা এই বাবা। উত্তাল সাগর তার ছেলেকে কেড়ে নিলেও জীবিকার তাগিদে সকল ভয় উপেক্ষা করে বাকি তিন ছেলেকে নিয়ে এখনো মাছ ধরেন তিনি। মাছ ধরতে গিয়ে ছেলে জীবন দিলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সন্তানহারা বাবা।
এফবি মান্নান ট্রলারের মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ী আ. মান্নান হাওলাদার (৫৪) জানালেন, ৩০ বছর নিজের ট্রলারেই সাগরে মাছ ধরতে যাই। আমার ট্রলারে ১৭ জন জাইল্যা। বহুবার দুর্যোগে পইড়া লাখ লাখ টাহার জাল হারাইছি, ট্রলারেরও অনেক ক্ষতি হইছে। কিন্তু সরকারি কোনো অনুদান পাই নাই। আমরা ব্যবসায়ীরা বছরে লাখ লাখ টাহা সরকাররে রাজস্ব দিই। কিন্তু আমারা কোনো ক্ষতিপূরণ পাই না।
শরণখোলা উপজেলার সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেনের ভাষ্য, আমাদের একেকটি ফিশিং ট্রলারের দাম আকারভেদে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রতি ট্রিপে একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে খরচ হয় দুই লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু সাগরে আগের মতো মাছ পড়ছে না। কোনো ট্রিপে চালান ওঠে, আবার লোকসানও যায় পুরো বিনিয়োগ। দুর্যোগে পড়ে অনেক সময় ট্রলার ডুবে সব শেষ হয়ে যায়। তাছাড়া বর্তমানে নতুন করে ভয়াবহ আকারে দেখা দিয়ে বন ও জলদস্যুদের উৎপাত। চাঁদা না দিয়ে সাগরে নামার উপায় নেই। আর না দিলে জেলেদের অপহরণ করে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে দস্যুরা। তার ওপর ইলিশের ভরা মৌসুমসহ বছরের অর্ধেক সময় বিভিন্ন মেয়াদে মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ঠিকমতো সাগরে জাল ফেলা সম্ভব হয় না। ফলে লোকসানে ঘানি টানতে টানতে সর্বশান্ত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার দাবি জানাই সরকারের কাছে।
এসব জেলে ও মহাজনদের ভাষ্য, দেশের মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি ও রক্ষার স্বার্থে সরকারি নিষেধাজ্ঞা তারা মানেন। কিন্তু সেই সময় তারা বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চান সরকারের কাছে। এ ছাড়া অবরোধকালীন প্রকৃত জেলেদের খাদ্য সহায়তা নিশ্চিতের পাশাপাশি নগদ অর্থ প্রদান, বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, জেলেশিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা সহায়তা, মহাজনদের সহজ শর্তে সুদমুক্ত ঋণ, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের ও ট্রলার মালিকদের পুনর্বাসন এবং বন, নদী ও সাগরে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
শরণখোলা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন সরকার বললেন, শরণখোলা উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৮১৪ জন। এর বাইরেও আরো জেলে রয়েছেন। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নিবন্ধিত কেউ সরকারি সহায়তা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন সরকার যোগ করলেন, নিবন্ধিত কোনো জেলে দুর্ঘটনায় আহত বা মারা গেলে তিন মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে তার পরিবারকে। যথা সময়ে আবেদন করলে সেই পরিবারকে ৫০ হাজার টাকার সহায়তা দেওয়া হয় মৎস্য অধিদপ্তর থেকে। অনেকেই অসচেতনতার কারণে আবেদন করতে দেরি করায় ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হন। এ ব্যাপারে জেলে সম্প্রদায়কে আমরা সচেতন করার চেষ্টা করি। এ ছাড়া সহজ শর্তে ঋণ এবং অন্যান্য সহায়তা বৃদ্ধির জেলে-মহাজনদের যে দাবি, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।






