সাগরপাড়ে বিদায়ের উৎসব
- লাবণী পয়েন্টে লাখো মানুষের সমাগম
- বিষাদ আর আনন্দে সম্প্রীতির মিলনমেলা

সাগরপাড়ে ঢাক ও শঙ্খের ধ্বনিতে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হচ্ছে
সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসছে একের পর এক প্রতিমা। ঢাকের বাদ্য আর ‘মা দুর্গা কি জয়’ স্লোগানে মুখর চারপাশ। কারও চোখে জল, কেউ আবার আনন্দে মাতোয়ারা। দেবী দুর্গার বিদায়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে বিষাদ, আর সেই বিদায়ের উৎসবে শামিল হয়েছেন অন্য ধর্মের মানুষ ও পর্যটকেরা।
আজ বুধবার বিজয়া দশমীর বিকালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্ট পরিণত হয় সম্প্রীতির এক বিশাল মিলনমেলায়। শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে সৈকতে মানুষের ঢল নামে। কক্সবাজার জেলা ছাড়াও পার্বত্য বান্দরবান ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা থেকে প্রতিমা নিয়ে আসেন ভক্তরা। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এবার সৈকতে ২০০টির বেশি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। কয়েক লাখ মানুষের সমাগমে সৈকতের বালিয়াড়ি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
দুপুর আড়াইটার দিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সম্প্রীতি সমাবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। পরে প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
বক্তারা কক্সবাজারের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, দুর্গোৎসবের এই আয়োজন ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সব সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
বিকাল তিনটার পর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমাবাহী ট্রাক আসতে শুরু করে সৈকতে। ঢাকঢোল ও নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ভক্তরা প্রতিমা নিয়ে এগিয়ে আসেন বিসর্জন মঞ্চের দিকে। একের পর এক প্রতিমা রাখা হয় বালিয়াড়িতে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। লাবণী পয়েন্ট ছাড়িয়ে সৈকতের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।
বিকাল পাঁচটার পর শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন। একে একে প্রতিমা সমুদ্রের লোনাজলে ভাসিয়ে দেন ভক্তরা। ঢেউয়ের সঙ্গে দেবীর বিদায় মুহূর্তে কারও চোখে ছিল অশ্রু, কারও কণ্ঠে জয়ধ্বনি। আনন্দ আর বিষাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠে পুরো সৈকত।
কক্সবাজার শহরের গোলদীঘিরপাড় এলাকার বাসিন্দা রাণীবালা দাশের চোখে তখন জল। তিনি বলেন, ‘মা দুর্গার বিদায়কে কোনোভাবে মেনে নিতে পারছি না। দুর্গা মায়ের জন্য আবার আরেকটি বছর অপেক্ষা করতে হবে।’
অন্যদিকে দুর্গাপূজার ছুটিতে ঢাকার মিরপুর থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছেন গিয়াস উদ্দিন ও সুরাইয়া খানম দম্পতি। সৈকতে প্রতিমা বিসর্জনের এই আয়োজন দেখে মুগ্ধ তারা। জীবনে এমন আয়োজন আগে দেখেননি বলে জানান এই দম্পতি। তাদের মতো বহু পর্যটকও সমুদ্রসৈকতে দুর্গোৎসবের সমাপনী আয়োজন উপভোগ করেন।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটে। পূজা ও নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানানো হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও কক্সবাজার সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন ছিল দুর্গোৎসবের শেষ পর্ব। তবে এ আয়োজন শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। নানা ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এটি হয়ে ওঠে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের প্রতীক।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কক্সবাজার জেলায় ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৪টি মণ্ডপে প্রতিমা পূজা এবং ১৭০টিতে ঘট পূজার আয়োজন ছিল। গত বছরের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ছয়টি।
জেলায় সবচেয়ে বেশি পূজামণ্ডপ ছিল চকরিয়া উপজেলায়, ৭১টি। কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৩১টি, ঈদগাঁওতে ২৯টি, মহেশখালী উপজেলায় ২৮টি এবং কক্সবাজার পৌরসভায় ২৮টি মণ্ডপে পূজা হয়। এ ছাড়া চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়া ও উখিয়ায় ৯টি করে এবং মহেশখালী পৌরসভা ও টেকনাফে ৬টি করে মণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উখিয়ার মণ্ডপের তালিকায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের একটি মণ্ডপও ছিল।
মণ্ডপভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর উপজেলা, কক্সবাজার পৌরসভা ও ঈদগাঁও মিলিয়ে ৮৮টি মণ্ডপে পূজা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬টিতে প্রতিমা পূজা এবং ৪২টিতে ঘট পূজা হয়। চকরিয়ার ৭১টি মণ্ডপের মধ্যে ৪১টিতে প্রতিমা পূজা ও ৩০টিতে ঘট পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কুতুবদিয়ার ৪৪টি মণ্ডপের মধ্যে ১৪টিতে প্রতিমা পূজা এবং ৩০টিতে ঘট পূজা হয়। রামুর ৩৭টি মণ্ডপের মধ্যে ২৩টিতে প্রতিমা পূজা ও ১৪টিতে ঘট পূজার আয়োজন ছিল। টেকনাফের ছয়টি মণ্ডপের মধ্যে পাঁচটিতে প্রতিমা পূজা এবং একটিতে ঘট পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
লাবণী পয়েন্টের বিসর্জন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান, ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার নিশাদ এঞ্জেলা, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দোলন ধর এবং জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সারা দেশে দুর্গাপূজা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। তার মতে, এটি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার ইতিবাচক দিক তুলে ধরে।’
হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দোলন ধর জানিয়েছেন, এবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ২০০টির বেশি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও বান্দরবান ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে প্রতিমা আনা হয় সৈকতে।
বিপুল মানুষের সমাগম ঘিরে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিসর্জন নির্বিঘ্ন করা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয় বিশেষ প্রস্তুতি।



