কুড়িগ্রামে মাছের খাদ্যেও আকাল সারের বদলে চুন

শরতের এই সময়ে পুকুরে কমে যায় পানির স্তর। একে একে কমতে থাকে মাছের প্রাকৃতিক খাবারও। সেই খাবার বাড়াতে দরকার হয় ইউরিয়া ও টিএসপি সার। কিন্তু কুড়িগ্রামে সহজে মিলছে না এই দুটির কোনোটিই। ধানের পর এবার সারের আকাল দেখা দিয়েছে পুকুরে। সার সংকটে থমকে যেতে বসেছে মাছের চাষ। মাথায় হাত কুড়িগ্রামের ২০ হাজার খামারির। বেশি দাম দিয়েও সার পাচ্ছেন না তারা।
সার না পেয়ে অনেকে বেছে নিয়েছেন বিকল্প পথ। বাধ্য হয়ে সারের বদলে চুন ও লবণের মিশ্রণ পুকুরে ছিটাচ্ছেন মাছচাষিরা। যদিও জেলার মৎস্য কর্মকর্তাদের দাবি, সব পুকুরে সারের প্রয়োজন নেই। খামারিদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ তাদের। অতিরিক্ত সার ব্যবহারেও করা হয়েছে বারণ।
জেলার মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলায় ২৬ হাজার ৮৮৪টি পুকুর রয়েছে এবং ২০ হাজারের বেশি মৎস্যচাষি। তবে সব পুকুরে সারের প্রয়োজন হয় না। যেসব পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাব হয়, মূলত সেসব পুকুরে দিতে হয় সার। কার্যালয়টির কর্মকর্তারা বললেন, পাঁচ ফুট কম গভীরতার পুকুরে প্রতি শতকে ১৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত সার দিতে হয়। সার দিলে মূলত পুকুরে তৈরি হয় প্রাকৃতিক খাদ্য ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুয়োপ্লাঙ্কটন। তাদের পরামর্শ পুকুরে অতিরিক্ত সার না প্রয়োগ করার। তবে ভিন্ন বক্তব্য চাষিদের। তাদের দাবি, সার ভালোমতো প্রয়োগ না করলে পুকুরের পানির মান ভালো থাকে না। মাছও হয় না বড়।
মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন খামারির সঙ্গে কথা বলে উঠে এলো সার সংকটের চিত্র। তাদেরই একজন জেলার রাজারহাট উপজেলার বোতলা এলাকার রফিকুল ইসলাম। জানালেন, দুই ও এক বিঘা আয়তনের দুটি পুকুর রয়েছে তার। প্রতি মাসেই সেখানে অল্প করে সার দেন। প্রতি বিঘায় ৭ কেজি ইউরিয়া ও ১.৫ কেজি টিএসপি লাগে তার। কিন্তু চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না ডিলারের দোকানে। ফলে বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আবার অনেক সময় দোকানেও মিলছে না সার।
একবারে বেশি সার দিলে খরচ বেশি হয়, তাই খরচ কমাতে প্রতি মাসে অল্প অল্প করে পুকুরে একবার সার ছিটান উপজেলাটির ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চৌকিদারপাড়ার মৎস্যচাষি নাজমুল ইসলাম। তার ভাষ্য, ‘হামার তো তিন বিঘার একনা ডিগি (দীঘি)। বছরে দুবার সার দিলেও হয়। হামার এটে পানি ভালো, তাও মাসে প্রায় ২২ কেজি ইউরিয়া আর পাঁচ কেজি টিএসপি দেওয়া নাগে। সার বুলি যাবার লাগছি। পাইমো কিনা সন্দেহে আছি।’
অন্যের পুকুর পরিচর্যা করেন এরশাদ আলী। জানালেন, ১৫ এবং ৮ একরের দুটি পুকুর দেখাশোনা করেন। বড় পুকুরটিতে সার দেন বছরে দুবার। কিছুদিন আগে ৪০ বস্তা ইউরিয়া এবং ১০ বস্তা জিপসার দিয়েছেন। এখন ছোট পুকুরটিতে সার দেওয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণ সার না পেয়ে তার পরিবর্তে চুন ও লবণের মিশ্রণ দিচ্ছেন পুকুরে।
জেলায় সবচেয়ে বেশি পুকুর রাজারহাট উপজেলায়। সংখ্যায় তা ৫ হাজার ৭০০টি। মৎস্যচাষি রয়েছেন ৪ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ জন।
উপজেলাটির বিদ্যানন্দ ইউনিয়েনের শুকদেব এলাকার মৎস্যচাষি শফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘সার নাই, কিন্তু মাছ তো বাঁচা লাগবে। ১২ একরের এত বড় পুকুরের সার আনতে তিনজন কামলা লাগে। আবার সার না দিলে পুকুরে প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হয় না, মাছের বৃদ্ধি কমে যায়। সার সংকটের কারণে মাছ চাষে খরচ বাড়ছে। লসে পড়ি নাকি, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না রাতে।’
তবে সার সংকটের কোনো তথ্য নেই রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হকের কাছে। বললেন, ‘উপজেলায় মৎস্যচাষিদের মাঝে সারের সংকট আছে, এরকম কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। যদি চাষিরা আমাদের কাছে আসে আমরা তাদের সারের ব্যবস্থা করে দেব। এ ছাড়া আমরা সারের বিকল্প পরামর্শ দেব।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দের কণ্ঠেও একই ধরনের সুর। তার ভাষ্য, সব পুকুরে সারের প্রয়োজন নেই। বললেন, ‘যেসব পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য কম, সেসব পুকুরে কিছুটা সারের প্রয়োজন হয়। তাও পুকুরভেদে শতকে ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত।’ মৎস্যচাষিদের প্রতি তার পরামর্শ পুকুরে বেশি সার না দেওয়ার।



