গরিবের ‘ফকু মাস্টার’

তিনি পরিচিত গরিবের ফকু মাস্টার নামে- আগামীর সময়
ছোট্ট টিনের ঘর। দলবেঁধে পড়ছে শিশুরা। খোলা জানালা দিয়ে ভেসে আসা শব্দ শুনলে মনে হবে যেন গ্রামের স্কুলের পাঠদান। কাছে যেতেই বিষয়টা পরিষ্কার। কোনো স্কুল নয়। একজন মানুষের স্বপ্ন। কেউ খাটের ওপর, কেউ মেঝেতে, আবার কেউ বারান্দায় বসে গভীর মনোযোগে ডুবে আছে বইয়ের পাতায়। স্নেহমাখা কণ্ঠে সামনে দাঁড়িয়ে ৭৩ বছরের বৃদ্ধ। আপন মনে পড়াচ্ছেন শিশুদের।
সবার কাছে তিনি পরিচিত ‘ফকু মাস্টার’ নামে। তার প্রকৃত নাম মো. ফখরুল আলম। বয়স শরীরে বার্ধক্যের ছাপ ফেলেছে। কিন্তু দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার জন্য তার স্বপ্ন আজও তরুণ। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের ধোয়াইল এলাকার বড়রিয়া গ্রামে তার বাস। অন্যের জমিতে টিনের ছোট্ট একটি ঘরই তার ঠিকানা। সেই ঘরের শোবার কক্ষই অসচ্ছল শিশুদের বিনামূল্যের পাঠশালা। এখানে পড়তে লাগে না কোনো ফি। নেই কোনো শর্ত। আছে শুধু একজন শিক্ষকের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
কেবল পড়াশোনা নয়, প্রতিদিন ক্লাস শেষে প্রতিটি শিশুর হাতে তুলে দেন একটি করে কলা, বিস্কুট। কখনো একটি ডিম। কোনো শিক্ষার্থীর বই-খাতা কেনার সামর্থ্য না থাকলে সেটির ব্যবস্থাও করেন তিনি। তার বিশ্বাস, ক্ষুধার্ত পেটে শিক্ষা আনন্দদায়ক হয় না।
সংসারে অভাব-অনটন তার নিত্যসঙ্গী। তবুও তিনি হার মানেননি। নিজের পুরোনো সাইকেলে চড়ে বছরের পর বছর গ্রাম থেকে গ্রামে গিয়ে নামমাত্র পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন। একসময় প্রতিদিন মাত্র ২০ টাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। যেদিন শিক্ষার্থী পড়ত, সেদিনই কেবল ২০ টাকা দিত; না পড়লে কোনো টাকা দিতে হতো না। আজও কয়েকটি বাড়িতে প্রাইভেট পড়িয়ে যে সামান্য আয় করেন, তার একটি বড় অংশ ব্যয় করেন বিনামূল্যের স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য।
একসময় স্থানীয় বাজারে বাজারে ঘুরে শিশুদের বই, খাতা ও খাবারের জন্য মানুষের কাছে সহযোগিতা চাইতেন। বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন আর সেই কাজ করতে পারেন না। তবুও এলাকার কেউ কেউ তার এই মহৎ উদ্যোগে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ান। প্রয়োজনের তুলনায় সেই সহায়তা খুবই সীমিত।
নিজের জীবনের গল্পটাও কম সুখের নয় বলে জানান এই প্রবীণ শিক্ষক। ‘ছাত্রজীবনে এসএসসি পরীক্ষার দুটি বিষয়ে অংশ নেওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়ি। অভাবের কারণে আর পড়াশোনা করা হয়নি। সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতে গ্রামে এসে শিশুদের পড়ানা শুরু করি। এই বয়সে আমার তেমন কোনো আক্ষেপ নেই, তবে একটি ইচ্ছা। যে কারণে আমি পড়াশোনা করতে পারিনি, সেই কষ্ট যেন আর কোনো শিশুকে পেতে না হয়। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন তাদের পড়িয়ে যেতে চাই,’ বলছিলেন ফকু মাস্টার।
ফখরুল আলম জানান, বর্তমানে তার ভোগান্তির কারণ একটি ভালো জায়গার অভাব। টিনের ছোট্ট ঘরে সবাইকে বসানো যায় না। বারান্দায় বা মেঝেতে বসেই ক্লাস করে অনেক শিশু। একটি বড় ঘর আর একটি ব্ল্যাকবোর্ডের স্বপ্ন দেখেন তিনি। সরকারের কাছে বড় কোনো দাবি নেই, নেই ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া। শুধু চান আরও বেশি শিশুর জীবনে যেন শিক্ষার আলো দিতে পারেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল হক বললেন, ‘ফখরুল স্যার একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে তিনি দরিদ্র শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।’
আজ যখন শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের কাছে বন্দি, তখন ফখরুল আলম নীরবে মনে করিয়ে দেন একজন প্রকৃত শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, মানুষের জীবনও গড়েন। হয়তো তার নামে কোনো বড় প্রতিষ্ঠান নেই, নেই কোনো সম্মানজনক পদবিও। কিন্তু শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ আর অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধার ভেতর তিনি ইতোমধ্যেই গরিবের মাস্টার হিসেবে ভালোবাসা পেয়ে যাচ্ছেন।






