উত্তাল নৌপথে ট্রলারে ঝুঁকির যাত্রা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কেউ যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য, কেউ কর্মস্থলে, কেউবা জীবিকার তাগিদে। কিন্তু মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপের বাসিন্দাদের পাড়ি দিতে হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল চ্যানেল। নিরাপদ যাতায়াতের জন্য চালু করা হয়েছিল সি-ট্রাক ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’। চার মাসের বেশি সময় ধরে সেটিও বন্ধ। বিকল্প নৌযান দেওয়ার আশ্বাস মিললেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে পুরোনো কাঠের ড্যানিশ বোট (ট্রলার) ও স্পিডবোটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন প্রায় দুই লাখ দ্বীপবাসী। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার সময় দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ছোট নৌযান ও ট্রলারের ওপর নির্ভরশীল মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সি-ট্রাক চালু করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ায় নিরাপদ যোগাযোগের উদ্যোগটি কার্যত থমকে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’ হাতিয়া নৌপথে নেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, হাতিয়ার সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে নৌযানটি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ভুল বোঝাবুঝির কথা বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে কুতুবদিয়া-মগনামা নৌপথে বিকল্প সি-ট্রাক দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়। তবে সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন এখনো হয়নি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পক্ষ থেকে বড়ঘোপ জেটিঘাটের পন্টুন মেরামতের কাজ শেষ করা হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) পক্ষ থেকে সি-ট্রাক চলাচল আবার চালুর দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’-এর পরিবর্তে ‘এসটি জব্বার’ দেওয়ার কথা থাকলেও দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, নৌযানটি এখনো কুতুবদিয়ায় পৌঁছায়নি।
মগনামা ঘাটের ইজারাদার নুরুল ইসলামের দাবি, ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’ আকারে বড় হওয়ায় এর পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি ছিল। যাত্রী সংখ্যা কম থাকায় ব্যয় কমাতে ছোট সি-ট্রাক দেওয়ার কথা বলে নৌযানটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
তার ভাষ্য, সি-ট্রাকের ধাক্কায় জেটির পন্টুন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে নতুন ডক তৈরি করে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা এবং অল্প সময়ের মধ্যে বিকল্প নৌযান দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও তা কার্যকর হয়নি। নতুন সি-ট্রাক কবে আসবে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।
কুতুবদিয়া চ্যানেল স্টেশনের ব্যবস্থাপক আশরাফ মিয়া বললেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মগনামা ঘাটের সি-ট্রাকটি সন্দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে কুতুবদিয়া-মগনামা নৌপথে নতুন সি-ট্রাক চালুর বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তার কাছে নেই।
নৌযান চালুর অনিশ্চয়তায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যেও। কুতুবদিয়ার বাসিন্দা প্রকৌশলী রবিউল হোছাইন মনে করেন, দ্বীপবাসীর স্বাভাবিক ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত নিয়মিত সি-ট্রাক সার্ভিস চালু করা জরুরি। এজন্য প্রয়োজনীয় নৌযান বরাদ্দ দিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলামও অবিলম্বে উপযুক্ত সি-ট্রাক বরাদ্দ দিয়ে নিয়মিত চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। নৌযান সরিয়ে নেওয়ার কারণ এবং বিকল্প ব্যবস্থা চালুতে বিলম্বের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাও চেয়েছেন তিনি।
কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আকবর খানের ভাষ্য, ‘কুতুবদিয়া যেন অভিভাবকহীন। আমরা কিছু পেলেও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারি না।’
এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘অস্থায়ীভাবে মেরামত করা জেটি দিয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় সি-ট্রাকে যাত্রী পারাপার চালু রাখা যায় কি না, তা নিয়ে ইজারাদারের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করা হবে।’
কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক নুরুল বশর চৌধুরীও জানিয়েছেন, সমস্যাটি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে এসব আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না দ্বীপবাসী। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি, নারী ও শিশুদের জন্য উত্তাল চ্যানেল পাড়ি দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার সময় নিরাপদ নৌযান পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাদের।





