কক্সবাজার
পানি কমার আশা ভেস্তে দিল বৃষ্টি

ছবি: আগামীর সময়
একদিনের জন্য মনে হয়েছিল বুঝি শেষ হতে চলেছে দুর্ভোগ। শনিবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টি কিছুটা কম থাকায় কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছিল বন্যার পানি। আশার আলো দেখেছিলেন পানিবন্দি মানুষ। কিন্তু দুপুর গড়াতেই আবার আকাশ কালো করে নামে মুষলধারে বৃষ্টি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই আশা ভেসে যায়। পানি কমার বদলে আবারও বাড়তে থাকে নিম্নাঞ্চলে। নতুন করে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও রান্না করার জায়গা নেই, কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট, কোথাও আবার নদী গিলে খাচ্ছে মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু।
টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদীর পানি বৃদ্ধিতে কক্সবাজার এখন বন্যা, পাহাড়ধস, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার বহুমুখী দুর্যোগে বিপর্যস্ত। গত ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া দুর্যোগে শনিবার রাত ও রবিবার আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে জেলায় পাহাড়ধস, পানিতে ডুবে, দেয়ালধস ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ জনে।
শনিবার রাতে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের পূর্ব কলাতলী ঝিরঝিরি পাড়ায় পাহাড়ধসে মারা যান গৃহবধূ রোজিনা আক্তার। রাতে রান্নাঘরে খাবারের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাশের পাহাড়ের একটি অংশ ধসে তার ওপর পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রায় দেড় ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তাকে বের করলেও হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
একই রাতে পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া এলাকায় বানের পানিতে ডুবে মারা যায় ১৯ মাস বয়সী শিশু মুশফিকুর রহিম। পরিবারের সদস্যদের অগোচরে ঘর থেকে বের হয়ে বাড়ির সামনে জমে থাকা বন্যার পানিতে পড়ে যায় সে। পরে চাচা পানিতে ভাসমান অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করলেও ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়।
চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের খোঁজাখালী জলদাসপাড়ায় বন্যার স্রোতে নিখোঁজ হওয়া ১২ বছর বয়সী সজীব জলদাসের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। শনিবার বিকেলে স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর রোববার বিকেলে ঘটনাস্থল থেকে কিছু দূরে তার মরদেহ পাওয়া যায়।
মানুষের পাশাপাশি টানা বর্ষণের শিকার হয়েছে বন্য প্রাণীও। টেকনাফের নাইট্যংপাড়া-শিয়ালিয়াঘোনা পাহাড়ে খাদ্য সংগ্রহের সময় প্রায় ৩০০ ফুট নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয় ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী একটি বন্য মা হাতি।
বন বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের টানা প্রায় ১৮ ঘণ্টার চেষ্টার পরও রবিবার সকালে প্রাণীটিকে বাঁচানো যায়নি।
বন বিভাগের ধারণা, টানা বর্ষণে পাহাড়ের ঢাল অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে হাতিটির ময়নাতদন্ত করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও ঈদগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ এলাকায়। বহু গ্রামের ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা এখনো পানির নিচে। হাজারো বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে।
চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ হোছাইন বলেছেন, ‘সাত দিন ধরে চুলায় আগুন জ্বলেনি। চারদিকে শুধু পানি। রান্না করার কোনো জায়গা নেই। পরিবার নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে।’
একই এলাকার আব্দু রশিদ বললেন, ‘প্রতি বছর একই দুর্ভোগ হলেও স্থায়ী সমাধান হয় না।’
অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা রফিক উদ্দিন, ইকবাল হোসেন ও ইয়াছিন আরাফাত দ্রুত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাকে বিশেষ দুর্গত অঞ্চল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।
রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের দৌছড়ি দক্ষিণকুল এলাকায় ভয়াবহ ভাঙনে বাকখালী নদী গিলে নিচ্ছে একের পর এক বসতভিটা। সিরাজুল হক বলেছেন, ‘দুই কক্ষের ঘর নদীতে চলে গেছে। এখন পুরো ভিটাটাই হারাতে বসেছি। পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব, জানি না।’
একই আতঙ্কে রয়েছেন বৃদ্ধ মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রী মমতাজ বেগম। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর একইভাবে ভাঙন হলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, সরকার ইতোমধ্যে ৩০ লাখ টাকা, ৪৫০ মেট্রিক টন চাল এবং শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন দল দুর্গত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।
তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার অধিকাংশ ইউনিয়ন কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি। বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্র চালু থাকলেও অনেক পরিবার নিজ বাড়িতেই মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানিয়েছেন, ৪ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত আট দিনে জেলায় ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ৫ জুলাই রেকর্ড হয় ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি। ১২ জুলাইও নবম দিনের মতো বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে।
আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলে পানি দ্রুত নামতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, এখন সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, খাবার এবং নদীভাঙন ও পাহাড়ধসের নতুন ঝুঁকি।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী খোকার ভাষায়, একদিকে টানা বর্ষণ, অন্যদিকে নদীর ভাঙন, পাহাড়ধস ও বন্যার পানি মিলিয়ে কক্সবাজারের মানুষের জন্য দুর্যোগ এখনো কাটেনি। বরং পানি কমার যে ক্ষীণ আশা জেগেছিল, তা আবারও ভাসিয়ে দিয়েছে নতুন বৃষ্টি।





