রাবিতে নতুন বিতর্ক, বহিষ্কার ইস্যু শিবিরের ‘নয়া কৌশল’!

সালাউদ্দিন আম্মার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারের একসময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ থাকার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে আলোচনায় তার রাজনৈতিক পরিচয়। ২০২৫ সালে শিবিরের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তার ‘সাথী’ পদ বাতিলের বিষয়টি এতদিন প্রকাশ্যে না থাকলেও সম্প্রতি সংগঠনটির একাধিক চিঠি সামনে আসায় তা নিয়ে ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
শিক্ষার্থীদের কেউ বলছেন, এতে আম্মারের দীর্ঘদিনের কথিত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়েছে; আবার কেউ মনে করছেন, রাকসু নির্বাচন ও ক্যাম্পাস রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পুরোনো বহিষ্কারের বিষয়টি এখন সামনে আসার পেছনে শিবিরের কৌশল থাকতে পারে।
বিষয়টি সামনে আসে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শিবিরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক এক নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের পর। পরে শিবিরের ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ও ১১ সেপ্টেম্বরের দুটি চিঠিসহ ২০২৬ সালের ৩১ জুলাইয়ের আরেকটি চিঠির তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এসব চিঠিতে আম্মারের ‘সাথী’ পদ স্থগিত ও পরে বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ রয়েছে।
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির চিঠিতে তৎকালীন রাবি শিবির সভাপতি ও রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষর ছিল। চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগ এবং নৈতিক পদস্খলনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তার ‘সাথী’ পদ স্থগিতের সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়। পরে ১১ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে দীর্ঘদিন সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং বারবার সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার পরও পরিবর্তন না আসায় তার ‘সাথী’ পদ বাতিলের কথা জানানো হয়।
সর্বশেষ গত ৩১ জুলাই তারিখের চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলন, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, নারীদের সঙ্গে ‘অবাধ বিচরণ’, অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। একই চিঠিতে তার সঙ্গে সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর সাংগঠনিক যোগাযোগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
শিবিরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান আম্মারের শিবির-সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার ভাষ্য, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসায় পড়ার সময় আম্মার শিবিরের ‘সাথী’ হন। পরে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় তার সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংশ্লিষ্টতা তৈরি হয়। ২০২৫ সালে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে জানান তিনি।
তবে শিবিরের এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর ক্যাম্পাসে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ভিন্নভাবে। চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী তাসনুভা আমিন বলেছেন, আম্মারের শিবির-সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে আসায় তিনি ‘খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন’। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শিবিরের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা নিয়ে যে বিতর্ক ছিল, সাম্প্রতিক তথ্যের পর বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে বলে মনে করেন তাসনুভা।
তার মতে, আম্মারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য নিয়ে ক্যাম্পাসে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। নারীদের নিয়ে তার কিছু বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটির বিষয়ে তার পূর্ণাঙ্গ ধারণা নেই বলেও জানান তিনি।
তাসনুভা আরো বলেছেন, সামনে রাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আম্মারকে নিয়ে ২০২৫ সালের বহিষ্কারের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসাকে তিনি শিবিরের একটি ‘স্ট্র্যাটেজি’ বা কৌশল হিসেবে দেখছেন। তার ধারণা, পরবর্তী রাকসু নির্বাচনে আম্মারের রাজনৈতিক ভূমিকা ও অবস্থানকে ঘিরে কোনো পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও পুরোনো বিষয়টি সামনে আনা হয়ে থাকতে পারে।
রাকসুর ভিপি ও শিবিরের কেন্দ্রীয় সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাকুর রহমান জাহিদ অবশ্য আম্মারের বর্তমান শিবির-সংশ্লিষ্টতার দাবি নাকচ করেছেন। তিনি বলেছেন, আম্মার বর্তমানে শিবিরের কেউ নন; তবে অতীতে তিনি সংগঠনের দ্বিতীয় স্তরের ‘সাথী’ ছিলেন। ক্যাম্পাসে আসার পর সাংগঠনিক নিয়ম-শৃঙ্খলার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারায় তাকে প্রথমে অব্যাহতি এবং পরে সংগঠন থেকে বাতিল করা হয়। মোস্তাকুর রহমানের ভাষ্য, আম্মারকে সংগঠন থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে নেওয়া হয়নি। সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী তাকে ফিরে আসার সুযোগও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি আর সংগঠনে ফেরেননি। ফলে এরপর থেকে আম্মারের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় শিবির নেবে না বলেও জানান তিনি।
এই বক্তব্যের সঙ্গে ২০২৫ সালের চিঠির তথ্যও মিলে যায়। কারণ, ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারির চিঠিতে আম্মারের ‘সাথী’ পদ স্থগিতের সিদ্ধান্তে তৎকালীন সভাপতি হিসেবে মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষর ছিল। অর্থাৎ বর্তমান রাকসু ভিপির সঙ্গে আম্মারের সাংগঠনিক সম্পর্কের বিষয়টি কেবল সাম্প্রতিক বক্তব্যের নয়; প্রকাশিত নথিতেও এর উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে আম্মারের সাবেক সাংগঠনিক পরিচয়ের তথ্য প্রকাশ্যে আসায় সর্বশেষ রাকসু নির্বাচন ঘিরে পুরোনো আলোচনাও নতুন করে সামনে এসেছে। ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে জিএস নির্বাচিত হন আম্মার। ওই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী সজীব পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এ কারণে প্যানেলটির সঙ্গে শিবিরের কথিত সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আম্মার ও শিবিরের নেতারা অতীতে এ ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণের কথা অস্বীকার করেছেন।
এদিকে শিবিরের বহিষ্কারের অভিযোগের বেশির ভাগই অস্বীকার করেছেন আম্মার। তার বক্তব্য, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর প্রমাণ তাকে দেওয়া হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো কাজ না করার প্রমাণ একজন কীভাবে দেবেন। তার দাবি, অভিযোগের প্রমাণ সংশ্লিষ্ট পক্ষকেই সামনে আনতে হবে। শিবিরের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়ে আম্মার বলেছেন, তিনি সংগঠনটির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যেই তা জানিয়েছেন।
শিবিরের অফিসিয়াল গানেও কাজ করার কথা উল্লেখ করে তিনি বললেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা আর সাংগঠনিকভাবে দায়িত্ব পালন করা এক বিষয় নয়।
বহিষ্কারের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আম্মার। তার বক্তব্য, বর্তমানে যারা তাকে বহিষ্কারের কথা বলছেন, তারা তার সাংগঠনিক দায়িত্বশীল ছিলেন কি না, সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। ২০২৫ সালের পুরোনো অভিযোগগুলো এখন কেন সামনে আনা হচ্ছে- এ প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তার ধারণা, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা থেকে দৃষ্টি সরাতেই পুরোনো বিষয়গুলো সামনে আনা হয়ে থাকতে পারে।
আম্মারের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগ নিয়েও ক্যাম্পাসে আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষার্থীদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, মববাজি, শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটিই আম্মার অস্বীকার করেছেন। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে না দেখে নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
রাবি শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাঈম তুহিনা বলেছেন, আম্মারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাঁর কিছু বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণের ওপর নির্ভর করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তুহিনা।
আরেক শিক্ষার্থী স্বপ্না আক্তার বলেছেন, ৫ আগস্টের পর আম্মারকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় দেখা গেছে। তার বিরুদ্ধে মববাজি, অন্যের কর্মকাণ্ডের কৃতিত্ব নেওয়া ও শিক্ষার্থীদের হয়রানির মতো অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত বলে মনে করেন স্বপ্না। আম্মারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও ক্যাম্পাসে নানা আলোচনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। কেউ তাকে শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করছেন, আবার কেউ নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন- এমন কথাও রয়েছে। তার মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অনুমানের বদলে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে আসা উচিত।
রাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সরদার জহুরুল হকও আম্মারের রাজনৈতিক পরিচয় ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া উচিত নয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী এবং গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।





