কোথায় আটকে আছে শেরপুরের তিন শহীদের বিচার?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মাহবুব আলম, শারদুল আশীষ সৌরভ ও সবুজ মিয়া
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শেরপুরে শহীদ তিন শিক্ষার্থী মাহবুব আলম, শারদুল আশীষ সৌরভ ও সবুজ মিয়া হত্যা মামলার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শুরু হয়নি।
আদালতের বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক অনুমোদন জটিলতায় বিচারকাজ আটকে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনরা।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় শেরপুর শহরের খরমপুর খাদ্যগুদাম এলাকায় সংঘটিত সহিংসতায় শহীদ হন তিন শিক্ষার্থী। অভিযোগ রয়েছে, তাদের গাড়িচাপা ও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আহত হন আরও অনেকে।
শহীদ মাহবুব আলম শেরপুর সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের তারাগড় কান্দাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং শেরপুর সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
পড়ালেখার পাশাপাশি বন্ধুদের নিয়ে একটি কম্পিউটার প্রশশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনা করতেন। প্রযুক্তি শিক্ষা ও নারীদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ৪ আগস্ট সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আন্দোলনের ঘটনাতেই তিনি নিহত হন।
শারদুল আশীষ সৌরভ ঝিনাইগাতী উপজেলার বাসিন্দা এবং শেরপুর সেকান্দার আলী কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। উচ্চশিক্ষা শেষে সমাজের জন্য কাজ করার স্বপ্ন ছিল তার। আন্দোলনের দিন সহিংসতায় প্রাণ হারান তিনি।
সবুজ মিয়া শ্রীবরদী উপজেলার রূপারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। সংসারের অভাব মেটাতে একটি ফার্মেসিতে কাজ করার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আন্দোলনের দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তিনি। পরে প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তিনি জিপিএ ৪ দশমিক ৩৩ অর্জন করেন।
ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই তিনটি হত্যা মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে শেরপুর সদর থানা পুলিশ। মামলাগুলোতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাবেক হুইপ ও সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ছয় উপজেলা চেয়ারম্যান, চার মেয়র, এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ মোট ৫০৫ জনকে আসামি করা হয়।
অভিযোগপত্র দাখিলের এক মাস পর মাহবুব আলম ও সবুজ মিয়া হত্যা মামলার বাদীরা আদালতে নারাজি আবেদন করেন। পরে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়। সম্প্রতি সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন শেরপুর জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান।
অন্যদিকে, শারদুল আশীষ সৌরভ হত্যা মামলার অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ কোনো আপত্তি না জানালেও মামলার বিচার এখনো শুরু হয়নি। জানা গেছে, মামলায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসামি থাকায় বিচার শুরুর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি প্রয়োজন। আদালত একাধিকবার চিঠি পাঠালেও এখনো কোনো জবাব না পাওয়ায় বিচারকাজ আটকে রয়েছে।
ছেলের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিল শেষে সৌরভের বাবা মো. সোহরাব হোসেন অভিযোগ করে জানিয়েছেন, এতদিনে তার ছেলের হত্যার বিচার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজও বিচার শুরু হয়নি। মামলার প্রধান অভিযুক্তদের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এখনো চাকরিতে রয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেতে আর কত সময় লাগবে, সেই প্রশ্নের উত্তরও তারা পাচ্ছেন না।
শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, পুলিশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শেরপুর জেলা জজ আদালতের অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেছেন, মাহবুব আলম ও সবুজ মিয়া হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন সিআইডি আদালতে জমা দিয়েছে। দ্রুত বিচার শুরুর চেষ্টা চলছে। আর সৌরভ হত্যা মামলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসামি থাকায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আদালত। অনুমতি পেলেই বিচারকাজ শুরু করা হবে।





