ভিক্ষা জুটলেই চুলা জ্বলে আমবেলার

সকাল হলেই লাঠিতে ভর দিয়ে ঘর থেকে বের হন আমবেলা বেগম। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, আছে নানা শারীরিক কষ্ট। তবু থেমে থাকার উপায় নেই। মানুষের কাছে হাত পেতে যা পান, তা দিয়ে কিনতে হয় চাল-ডাল। বাড়ি ফিরে নিজ হাতে রান্না করে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে খেতে বসেন। কোনোদিন ভিক্ষা করতে না পারলে জ্বলে না চুলা, থাকতে হয় উপোস।
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার স্বজনগ্রামের বাসিন্দা আমবেলা বেগমের বয়স ৭০ বছর। অসুস্থ স্বামী আফতর হোসেনকে নিয়ে প্রায় ১৫ বছর ধরে শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে দীঘিরপাড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। মাসে ভাড়া দিতে হয় ২ হাজার টাকা। ভিক্ষা করে পাওয়া সামান্য অর্থেই চলে তাদের দুজনের সংসার।
শায়েস্তাগঞ্জ শহরে ভিক্ষা করার সময় কথা হয় আমবেলা বেগমের সঙ্গে। তার কথায় উঠে আসে বার্ধক্য, দারিদ্র্য আর একাকিত্বের মধ্যে প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই। ‘একসময় তার স্বামী কৃষিকাজ করতেন। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সংসারও চলছিল মোটামুটি ভালোভাবে। কিন্তু ছেলের বিয়ের পর পুত্রবধূর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় স্বামীকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান তারা। এর মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন আফতর হোসেন। গ্রামে সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠলে জীবিকার সন্ধানে তারা চলে আসেন শায়েস্তাগঞ্জে’— বলছিলেন আমবেলা।
বর্তমানে তাদের ছেলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে স্বজনগ্রামে থাকেন। কৃষিকাজ করে নিজের সংসার চালান তিনি। অন্যদিকে বৃদ্ধ মা-বাবার দিন কাটে অভাবের মধ্যে। অসুস্থ স্বামীর দেখাশোনা, বাজার করা, রান্না এবং খাবার জোগাড়— সব দায়িত্বই পালন করতে হয় আমবেলা বেগমকে।
তার ভাষায়, শরীর আর আগের মতো চলে না। কিন্তু পেটের দায়ে প্রতিদিন সকালে লাঠি হাতে বের হতে হয়। সারা দিন শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে যা পান, তা দিয়ে বিকালে বাজার করে বাড়ি ফেরেন। এরপর নিজেই রান্না করেন। কোনো রকমে খাবার জুটলেও বাসাভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকারি সহায়তার আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছেও গিয়েছেন আমবেলা বেগম। তার অভিযোগ, সরকারি ভাতার কার্ডের জন্য জনপ্রতিনিধিদের কাছে বহুবার আবেদন করেও কোনো সহায়তা পাননি। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও ফল না পেয়ে এখন আর আশা করেন না।
আক্ষেপ নিয়ে আমবেলা বেগম বলেছেন, ‘ভিক্ষা করলে চুলায় আগুন জ্বলে। ভিক্ষা করতে না পারলে চুলায় আগুন জ্বলে না। না খেয়েই থাকতে হয়।’ জীবনের এই বয়সে যেখানে বিশ্রাম ও পরিবারের সান্নিধ্য পাওয়ার কথা, সেখানে প্রতিদিন খাবার জোগাড়ের চিন্তায় কাটে তার সময়। নিজের বার্ধক্য সামলানোর পাশাপাশি অসুস্থ স্বামীর দায়িত্বও তাকে একাই বহন করতে হচ্ছে।
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বীরেন্দ্র লাল রায় মনে করেন, আমবেলা বেগমের মতো অসহায় প্রবীণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন।



