মোবাইল নাম্বার জটিলতা
লটারিতে নাম থাকলেও ধান বেচতে পারছে না কৃষক
- ধান ঘরে আছে, বিক্রির পথ নেই
- ফোন নম্বর জরুরি নাকি কৃষক
- সুযোগ নিয়েছে দালালচক্র ও তৃতীয় পক্ষ

ছবি: আগামীর সময়
গোলা প্রায় ফাঁকা। উঠোনের এক কোণে পড়ে থাকা বোরো ধানের শেষ স্তূপটিও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। কিছুদিন আগেও এই ধান ঘিরেই ছিল কৃষক শহিদুল ইসলামের সব পরিকল্পনা। ঋণের চাপ কিছুটা কমানো, সংসারের খরচ সামাল দেওয়া, আর মৌসুম শেষে একটু আর্থিক স্বস্তি। এইতো!
সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। লটারিতে উঠেছিল নাম। মনে করেছিলেন, এবার হয়তো মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত ন্যায্যমূল্য। কিন্তু গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের কৃষক শহিদুলের সে আশা আটকে গেছে বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে।
ধান ঘরে আছে, বিক্রির পথ নেই
শুধু শহিদুল নন, চলতি বোরো মৌসুমে তথ্যগত জটিলতায় বিপাকে পড়েছেন উপজেলার প্রায় দেড় হাজার প্রান্তিক কৃষক। সরকারি অনলাইনভিত্তিক ধান ক্রয় ব্যবস্থায় কৃষকের তথ্য যাচাই ও লটারি পদ্ধতিতে মাঠপর্যায়ের তথ্যগত অসামঞ্জস্য এখন পরিণত হয়েছে বড় সমস্যায়। ফলে লটারিতে নির্বাচিত কৃষকরাও শিকার হচ্ছেন ভোগান্তির।
সুন্দরগঞ্জে চলতি মৌসুমে ধান কেনার জন্য অনলাইন লটারির মাধ্যমে কৃষক বাছাই করেছে খাদ্য বিভাগ। লটারিতে প্রতি কৃষক এক টন ধান বিক্রির সুযোগ পাবেন। এতে ১ হাজার ৯৬৫ জন কৃষকের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু লটারিতে বিজয়ী কৃষকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বরের সঙ্গে যুক্ত অন্য একজনের মোবাইল নাম্বার। এই সামান্য ভুলই তাদের জন্য দাঁড়িয়েছে বাধা হয়ে। লটারিতে নাম উঠলেও সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বর তাদের না হওয়ায় গুদামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না তারা।
শহিদুল জানালেন, লটারিতে নাম আসার পর তিনি আলাদা করে ধান রেখেছিলেন। ভেবেছিলেন, সরকারি দরে বিক্রি করতে পারলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে। কিন্তু এখন প্রতিদিনই তাকে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে। সমাধান মিলছে না। তার ভাষায়, ধান ঘরে আছে, কিন্তু বিক্রির পথ নেই।
একই সমস্যায় পড়েছেন উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের আরেক কৃষক সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, তার নামে ধান বিক্রয়ের আবেদন অন্যজন করেছেন। লটারিতে নাম আসার বিষয়টি জানার পর নিজেই খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু তার এনআইডির সঙ্গে যে ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে সেটি অন্যজনের। সেই নম্বরে ফোন দিলে আরেক ব্যক্তি ধরছেন। এ কারণে তার নামে ধান কেনা স্থগিত। এখন বাধ্য হয়ে লোকসানে স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
আরেক কৃষক জাহানারা বেগম বললেন, ‘আমার এনআইডি নিয়ে অন্য কেউ অনলাইনে আবেদন করেছে। কিন্তু যে ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে সেটি আমার নয়। কাগজে ভুল থাকায় গুদামে আমার নামে ধান নিচ্ছে না।’
‘যেখানে এনআইডি আমার, ফোন নম্বরের কারণে আমার ধান কিনবে না কেন? এখানে ফোন নম্বর জরুরি নাকি আমি কৃষক গুরুত্বপূর্ণ?’ প্রশ্ন করেন তিনি।
সুযোগ নিয়েছে দালালচক্র ও তৃতীয় পক্ষ
সম্প্রতি গাইবান্ধা জেলায় ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা। এ সময় সদর উপজেলায় লটারিতে বিজয়ী এক নারীর ফোনে কল দিলে ধরেন অপর ব্যক্তি। তিনি জানান, পারভীন নামে কোনো নারীকে চেনেন না তিনি। বিষয়টি সামনে আসার পর জেলা প্রশাসক সব উপজেলার তালিকায় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ভুল নম্বর শনাক্ত করে যাচাই শেষে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছেন।
এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সময় লাগছে। আর সেই সময়ই এখন কৃষকের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট। ধান ঘরে পড়ে থাকলেও বাজারে দাম প্রতিদিনই ওঠানামা করছে। নগদ টাকার চাপে অনেক কৃষক অপেক্ষা করতে না পেরে স্থানীয় ফড়িয়াদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার আশা অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ হচ্ছে না।
জেলা খাদ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কৃষকের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর মিলিয়ে অনলাইন নিবন্ধন হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকেরা নিজেরা সরাসরি তথ্য না দিয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিবন্ধন করেছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে অসাধু চক্র অন্যের এনআইডি ও ভিন্ন মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আবেদন করেছে। ফলে প্রকৃত কৃষক শনাক্তে তৈরি হয়েছে জটিলতা। সে কারণে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অনেকের ধান ক্রয় প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
কৃষি অফিসের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৩ হাজার ১৮৭ জন কৃষকের কাছ থেকে ৯ হাজার ৫৬৩ মেট্রিক টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কেজি ধানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ টাকা। বরাদ্দ অনুযায়ী সদর উপজেলায় ১ হাজার ৬৬৪ টন, সাঘাটায় ১ হাজার ৫১, সাদুল্লাপুরে ১ হাজার ১৪৬, সুন্দরগঞ্জে ১ হাজার ৯৬৫, গোবিন্দগঞ্জে ২ হাজার ৩৭৬, পলাশবাড়ীতে ৯২১ এবং ফুলছড়িতে ৫৪০ টন ধান সংগ্রহ করা হবে।
তবে জেলার ৬টি উপজেলাসহ সারাদেশে একজন কৃষক তিন মেট্রিক টন পর্যন্ত ধান বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু সুন্দরগঞ্জের কৃষকরা মাত্র এক টন ধান সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবে। এতে বরাদ্দ কমানোর ফলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুবিধাভোগীরা।
কৃষকদের অভিযোগ, ধান বিক্রয়ের অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে তাদের বাস্তব ধারণা নেই। সেই সুযোগ নিয়েছে দালালচক্র ও তৃতীয় পক্ষ। এখন সেই নাম্বারগত জটিলতা অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে ধান কেনা আটকে দেওয়া হচ্ছে। তাদের মতে, এটি খাদ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনা। মাঠের বাস্তবতা উপেক্ষা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনে। তাই এনআইডি অনুযায়ী কৃষকের তথ্য সঠিক থাকলে মোবাইল নাম্বারজনিত সমস্যার কারণে তাদের বঞ্চিত করা উচিত নয়।’
তিনি জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পূর্ণ ধারণা থাকে না। পুরনো অ্যাপসে বিপুলসংখ্যক ভুল মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে নিবন্ধন করা হয়েছিল। সেই তথ্য নতুন অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে জটিলতা বেড়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দালালচক্র যদি অন্যের এনআইডি নিয়ে আবেদন করে, তার দায় প্রকৃত কৃষক কেন বহন করবেন? অনেক কৃষক লটারিতে নাম আসার পর জানতে পারছেন তাদের নামে আগে থেকেই আবেদন করা হয়েছিল।
যা বলছে অনুসন্ধান
এদিকে, আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। অনলাইন নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় খাদ্য বিভাগের তথ্যগত দুর্বলতাই সমস্যার উৎস। ২০১৯ সালের নভেম্বরে কৃষকের অ্যাপে ধান বিক্রয়ের নিবন্ধন চালু হলেও তখন কৃষকদের অনেকেরই ডিজিটাল জ্ঞান ছিল না। সে সময় সিস্টেম দুর্বলতার কারণে সহজে অনলাইন নিবন্ধন করা যেত। সেই সুযোগে বিভিন্ন জায়গা থেকে এনআইডি কপি সংগ্রহ করে অসাধু চক্র ভুয়া নিবন্ধন তৈরি করে। তখন ওটিপি যাচাই ব্যবস্থা না থাকায় এই অনিয়ম আরও সহজ হয়।
বিগত পাঁচ বছরে সুন্দরগঞ্জে ভুয়া ফোন নম্বর ব্যবহার করে প্রায় অর্ধলক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। চলতি বছর কৃষক নিবন্ধনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ হাজারে। চলতি বোরো মৌসুমে ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা মিলে ধান বিক্রয়ের আবেদন এসেছে ৩৯ হাজার। এসব আবেদনে ইচ্ছেমতো মোবাইল নম্বর যুক্ত হওয়ায় অনেক প্রকৃত কৃষকের তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কৃষকের অ্যাপে ওটিপি যাচাই ছাড়াই যেসব আবেদন জমা পড়েছিল, সেগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি জটিলতা তৈরি করছে। ওই সময় মোবাইল নাম্বার যাচাই ব্যবস্থা না থাকায় বিপুলসংখ্যক ভুয়া ও অসংগত নম্বর যুক্ত হয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন হয়, যার প্রভাব এখনো বিদ্যামান।
২০২৫ সালে নতুন একটি অ্যাপ চালু করা হয়, যেখানে আবেদন প্রক্রিয়ায় মোবাইল নাম্বার যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়। এতে নতুন করে ভুয়া নাম্বার দিয়ে নিবন্ধনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তবে পুরনো অ্যাপের তথ্য নতুন সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বয়ের সময় আগের অযাচাইকৃত ও ভুয়া নাম্বারযুক্ত রেকর্ডও যুক্ত হয়ে যায়। ফলে পুরনো অনিয়ম বহাল থাকে নতুন কাঠামোর মধ্যেও। যদিও দুই অ্যাপসের তথ্য সমন্বয়ের বিষয়ে কিছুই জানেন না জেলার কর্মকর্তারা।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক স্বপন কুমার, খাদ্য ক্রয় কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি জানাচ্ছেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে লটারিতে নির্বাচিত কৃষকদের তালিকা যাচাই হচ্ছে। যাচাই শেষে যাদের তথ্য সঠিক থাকবে, তাদের কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী ধান কেনা হবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মিজানুর রহমান বলছেন, পূর্বের অ্যাপে ওটিপি যাচাই ছাড়াই নিবন্ধিত হওয়া কিংবা ভুল নম্বর ব্যবহারের কারণে যেসব জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তথ্য সঠিক প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কৃষক ধান বিক্রি করতে পারবেন। তবে ভুয়া বা অসঙ্গত তথ্য পাওয়া গেলে তাদের কাছ থেকে ধান কেনা হবে না।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লার বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।




