পূর্বধলায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বঞ্চিত, বিতর্কিত প্রণোদনা তালিকা

ছবি: আগামীর সময়
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় ইরি-বোরো মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির উপকারভোগীর তালিকা প্রণয়ন ও বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে সরকারি চাকরিজীবী, প্রবাসী, রাজনৈতিক কর্মী, চায়ের দোকানদার, ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক, গার্মেন্টসকর্মী এবং সাংবাদিকদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে অফিসে বসেই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা সরকারি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, আর কৃষিকাজের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই, এমন ব্যক্তিরা তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬৩ জন কৃষকের নাম প্রণোদনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের অনেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। এমনকি যেসব এলাকায় ফসলের কোনো ক্ষতি হয়নি, সেসব এলাকার অনেকের নামও তালিকায় রয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম তালিকায় আসেনি। এছাড়া অনেক ইউনিয়নে একই পরিবারের চার থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং একই ব্যক্তির নাম একাধিকবারও এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই অনিয়মের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন। গত ১০ জুন ঘাগড়া ইউনিয়নে, ১৫ জুন জারিয়া ইউনিয়নে এবং ১৬ জুন হোগলা ইউনিয়নে প্রণোদনা বিতরণের সময় কৃষকেরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানান এবং তালিকা তৈরিতে চরম অস্বচ্ছতার অভিযোগ তোলেন।
অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে কৃষকেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে ১০টিরও বেশি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাদের দাবি, বর্তমান তালিকা বাতিল করে নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাভুক্ত করতে হবে।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, প্রণোদনা বিতরণের সময় মূল তালিকায় থাকা নাম, বাবার নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর কেটে প্রভাবশালীদের আত্মীয়-স্বজন ও পছন্দের ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বারবার অভিযোগ করেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এ বিষয়ে কয়েকজন কৃষক বলেছেন, ‘যারা সারা বছর মাঠে কাজ করেন এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের নাম তালিকায় নেই। অথচ কৃষিকাজের সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক নেই, তারা সরকারি প্রণোদনা পাচ্ছেন।’
তালিকা পর্যালোচনা করে অভিযোগ উঠেছে, তালিকাভুক্তদের মধ্যে ৩০ শতাংশেরও বেশি ব্যক্তির কোনো কৃষিজমি নেই এবং তারা কৃষিকাজও করেন না। তবুও তারা কৃষি প্রণোদনার সুবিধাভোগী হয়েছেন। এ বিষয়ে অনেকেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েকজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তাঁদের পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এনআইডিসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা প্রস্তুত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় নিয়মিত যান না এবং স্থানীয় চাষিদের জমি সম্পর্কে যথাযথ ধারণাও নেই। ফলে দুর্যোগের সময় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন পাঠানো সম্ভব হয়নি।
তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে একাধিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতেই তালিকা করা হয়েছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জুবায়ের হোসেন বলেছেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করতে হয়েছে। তালিকা তৈরির পর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে নতুন করে আরও কিছু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সে কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন হয়তো তালিকার বাইরে থেকে গেছেন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘জেলা প্রশাসনের বরাদ্দ অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কৃষকদের মধ্যে প্রণোদনা বিতরণ করা হচ্ছে। তবে অনিয়মের বিষয়ে কয়েকটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা বলেছেন, ‘কীভাবে কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, তা আমার জানা নেই। তবে কোনো ধরনের অসঙ্গতি থেকে থাকলে কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
উল্লেখ্য, এই প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক কৃষক একেক কিস্তিতে ৩ হাজার টাকা এবং ১৫ কেজি চাল পাওয়ার কথা। মোট তিন কিস্তিতে একজন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৯ হাজার টাকা ও ৪৫ কেজি চাল পাবেন। এরই মধ্যে দুই কিস্তির ৬ হাজার টাকা ও ৩০ কেজি চাল বিতরণ করা হয়েছে।




