নাব্য সংকটে অকার্যকর নৌপথ, ব্রহ্মপুত্রে সেতু হবে কবে

গাইবান্ধার বালাসী ঘাটে শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। ছবি : আগামীর সময়
ভোরের আলো ফুটতেই গাইবান্ধার বালাসী ঘাটে শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। ওপারে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ। ব্রহ্মপুত্র নদ বিভক্ত করেছে এই দুটি অঞ্চলকে। দূরত্ব খুব বেশি নয়, অথচ সড়কপথে বাহাদুরাবাদ যেতে হয় দীর্ঘ ঘুরপথে। বিচ্ছিন্ন এ দুই জনপদকে এক সুতোয় বাঁধতে সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। কারণ, সেতু হলে ঢাকার সঙ্গে কমবে দূরত্ব, সহজ হবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্য। তাই ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ের মানুষের অপেক্ষা— কবে নদীর বুক চিরে দাঁড়াবে সেই কাঙ্ক্ষিত সেতু।
কারণ সেতু না থাকায় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট বা পঞ্চগড় থেকে গুরুতর রোগীকে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে নিতে হলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ময়মনসিংহ বা দেশের অন্য বড় চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। অ্যাম্বুলেন্সকে ঘুরপথে যেতে হয়। পথে যানজট থাকলে সময় আরও বাড়ে।
সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় ফুটে উঠেছে ভোগান্তির সেই চিত্র। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী থেকে ঢাকার দিকে ছুটছিল একটি অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে গুরুতর অসুস্থ একজন মানুষ। পাশে বসা স্বজনদের চোখে ছিল না ঘুম। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোই তাদের একমাত্র চিন্তা। কিন্তু সামনে দীর্ঘ পথ। যমুনা সেতু হয়ে ঘুরে রাজধানীতে পৌঁছাতে সময় লাগবে আরও কয়েক ঘণ্টা। প্রায় একই সময়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের এক তরুণ ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরদিন চাকরির পরীক্ষা। রাতের বাসেই তাকে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ। ক্লান্ত শরীর নিয়ে পরীক্ষার হলে বসতে হবে। তার মতো হাজারো তরুণের কাছে ঢাকার দূরত্ব শুধু মানচিত্রের হিসাব নয়, স্বপ্নপূরণের পথে বাস্তব এক বাধা।
গল্প দুটি আলাদা হলেও সমস্যার জায়গাটি একই— যোগাযোগ। রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষের জীবন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসার সঙ্গে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
একসময় বালাসী-বাহাদুরাবাদ ছিল গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ২৬ কিলোমিটার এই নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নিয়মিত চলত নৌযান। পরে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের নাব্য কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। নৌপথ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তবে তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ওয়াহিদুজ্জামান বিশ্বাস তোহার মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন সেতু।
স্থানীয়রা বলছেন, বালাসী-বাহাদুরাবাদে সেতু হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের মধ্যাঞ্চলের যোগাযোগের একটি সরাসরি পথ তৈরি হবে। এতে শুধু যাত্রার সময় কমবে না, জরুরি চিকিৎসাসেবায় পৌঁছানোর সুযোগও দ্রুততর হবে।
পঞ্চগড়ের তরুণ লুৎফুল কবীরের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। ঢাকায় চাকরির পরীক্ষা দিতে হলে তাকে এক দিন আগে বাড়ি থেকে বের হতে হয়। দীর্ঘ সময় বাসে কাটিয়ে রাজধানীতে পৌঁছাতে হয় পরদিন। পরীক্ষার আগের রাতটি অনেক সময় বিশ্রামের বদলে কেটে যায় পথে।
শুধু চাকরিপ্রার্থী নন, প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা ও উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানী এবং দেশের বড় শহরগুলোতে যান। দীর্ঘ যাত্রা, অতিরিক্ত খরচ এবং শারীরিক ক্লান্তি তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে। সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা হলে সেই চাপ অনেকটাই কমতে পারে বলে মনে করেন তারা।
কৃষকদের ভাষ্য, রংপুর বিভাগ কৃষিনির্ভর অঞ্চল। ধান, ভুট্টা, আলু, গম ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি উৎপাদনে এ অঞ্চলের বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ভালো হলেই কৃষকের লাভ নিশ্চিত হয় না। দীর্ঘ পথে পরিবহন করতে গিয়ে ব্যয় বাড়ে। পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সময়ও বড় বিষয়।
গাইবান্ধা জেলা বিএনপি সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক অধ্যাপক ডা. ময়নুল হাসান সাদিকের মতে, পরিবহন ব্যয় কমলে কৃষিপণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে। এর পাশাপাশি শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গতি আসবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বালাসী-বাহাদুরাবাদে সেতু নির্মিত হলে গাইবান্ধা থেকে ঢাকার সড়ক দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার কমতে পারে। রংপুর বিভাগের অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রেও কমতে পারে প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার।
অবশ্য সেতু বিভাগও সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে। বর্তমানে দুটি সম্ভাব্য রুট নিয়ে সমীক্ষা চলছে। একটি হলো গাইবান্ধার বালাসী থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ এবং অন্যটি বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুর।
সেতুর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানও। তার ভাষায়, ফুলছড়ি ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জকে সেতুর মাধ্যমে যুক্ত করা গেলে রংপুর এবং ময়মনসিংহ বিভাগের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে। এর প্রভাব পড়বে পরিবহন, কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা ও চিকিৎসায়।





