সেরা ডুবুরির ডুবে মৃত্যু কীভাবে- প্রশ্ন পরিবারের

শীতলক্ষ্যায় ডুবে মৃত ডুবুরি সাদিকের পদক পাওয়ার মুহূর্ত। ছবি: সংগৃহীত
কৃতি সন্তানের মৃত্যুর খবরে পাগলপ্রায় লিলি বেগম। ছেলের অর্জন করা রাষ্ট্রীয় পদক বুকে আগলে করছেন বিলাপ। মানতে পারছেন না, সেরা ডুবুরির পদক ঘরে আনা ছেলে পানিতেই হারিয়েছেন প্রাণ।
‘আমার বুকের ধন, আমার চোখের মণি, তুই আর কোনোদিন মা বলে ডাকবি না...’- আহাজারি সাদিক হোসেন শুভর মায়ের।
রাজবাড়ির ছেলে সাদিক (২৬) কাজ করতেন নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনে। সেরা ডুবুরি হিসেবে গত বছরই পেয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিসের রাষ্ট্রীয় পদক। গত মাসে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে লেকে ডুবে যাওয়া তিনজনের মরদেহ উদ্ধারে ছিলেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়ে ছিলেন নিখোঁজ। আট ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করেন সহকর্মীরা।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কুমড়াকান্দি গ্রামে সাদিকের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল শোকার্ত পরিবেশ। সবার চোখেমুখে একটাই প্রশ্ন, সেরা ডুবুরির এমন মৃত্যু কীভাবে সম্ভব।
‘মাত্র দুই বছর হলো আমাদের বিয়ের। কত স্বপ্ন ছিল আমাদের। ও সব সময় বলত, মানুষের জীবন বাঁচানোই তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। প্রতিটি অভিযানে যাওয়ার সময় বুক কাঁপত, তবুও ওকে সাহস দিতাম। কখনো ভাবিনি, একদিন সেই মানুষটাকেই নিথর হয়ে ফিরে পেতে হবে। আমার স্বামী শত শত মানুষের স্বজনকে ফিরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু আজ আমি আমার স্বামীকে আর জীবিত ফিরে পেলাম না। আমি শুধু চাই, কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল তার সঠিক তদন্ত হোক এবং প্রকৃত সত্য সবার সামনে আসুক- বলছিলেন সাদিকের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার।
ছেলের শেষ স্মৃতির কথা বললেন লিলি- ‘বৃহস্পতিবার সকালে ওর বাবার কাছে ফোন করে পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছিল। তিন দিন আগেও আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। বলেছিল, সামনের সপ্তাহে বাড়ি আসবে। দুই বছর আগে বিয়ে দিয়েছিলাম তাকে। আমার সোনার ছেলে আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না, মা বলে ডাকবে না। আমার ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনুক সরকার।’
কুমড়াকান্দি গ্রামের আশরাফ আলী শেখের চার ছেলে মেয়ের মধ্যে মেজো সাদিক। কর্মজীবনে অসংখ্য ডুবে যাওয়া মানুষ কিংবা মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন। গত ১৯ মে পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (সেবা) পদক।
তার চাচা গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ফজলুল হক বললেন, ‘যে ছেলে মানুষের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে রাখত, সেই ছেলে কীভাবে নদীতে ডুবে মারা গেল- এ প্রশ্নের উত্তর আমরা চাই। ঘটনাটি শুধু দুর্ঘটনা বলে মেনে নেওয়া কঠিন। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।’
ঢাকায় ফায়ার সার্ভিসের প্রধান কার্যালয়ে জুমার নামাজের পর প্রথম জানাজা শেষে সাদিকের মরদেহ বিকালে পৌঁছানোর কথা বাড়িতে। দ্বিতীয় জানাজা শেষে নিজ গ্রামেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন জেলার এই কৃতি সন্তান।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন গতকাল জানিয়েছিলেন সাদিকের মৃত্যুর তথ্য। বলছিলেন, শীতলক্ষ্যা নদী ফায়ার স্টেশনের জেটির সামনে প্রায়ই জমে কচুরিপানা। গতকাল সকালে সেসব পরিষ্কারে কাজ করছিলেন সাদিকসহ তিন ডুবুরি। স্পিডবোটের সামনের দিকে থাকা সাদিক ঢেউয়ের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যান নদীতে।
সাদিকের মৃত্যু ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নে আরেফিনের কথা, ‘এটি নিছক একটি দুর্ঘটনাই মনে হচ্ছে। তিনটি স্পিডবোট পাশাপাশি ছিল, কচুরিপানা পরিষ্কার করার জন্য সাদিক নদীতে নামলে হয়ত স্পিডবোট এবং পাশে থাকা পল্টুনের নিচে দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। আমরা তার মরদেহ ঘটনাস্থলের ৪০০ গজ দূর থেকে উদ্ধার করি। স্রোতে তার মরদেহ ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তার শরীর কোথাও আটকে ছিল না।’
পড়ার সময় সাদিক মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন বলে ধারণা করেন ঘটনার সময় তার সঙ্গে থাকা অন্য দুই ডুবুরি। তাদের বরাতে এ তথ্যও জানিয়েছেন আরেফিন। সাদিকের মতো প্রশিক্ষিত ডুবুরির মৃত্যু বাহিনীর বড় ক্ষতি ও শূন্যতা তৈরি করেছে বলেও জানালেন তিনি।
মৃত্যুর এই ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস ঢাকার উপপরিচালক সালেহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি- বললেন জেলা ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল আরেফিন।








