দুই হাত নেই, তবু থামেননি নিহাল

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। আকাশ মেঘে ঢাকা। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী বাজারে একটি বটগাছের নিচে ছোট্ট টিনের দোকানে ততক্ষণে চুলা জ্বলে উঠেছে। কাপ ধুচ্ছেন একজন তরুণ— তবে হাত দিয়ে নয়, দুই কনুই দিয়ে।
তার নাম মোহাম্মদ মেহরাফ হোসাইন নিহাল। বয়স ২৩। দুই হাতের কনুইয়ের পর আর কিছু নেই তার। তবু প্রতিদিন ভোরে উঠে দোকান খোলেন, চা বানান, ক্রেতার হাতে কাপ তুলে দেন— একা।
কাপে চিনি আর আদা মেপে দেন কনুইয়ের সাহায্যে। জ্বলন্ত চুলা থেকে কেটলি তুলে গরম চা ঢালেন বিশেষ কায়দায়। চামচ দিয়ে নেড়ে তৈরি চা তুলে দেন ক্রেতার হাতে। দেখলে বোঝার উপায় নেই এই কাজটুকু তার জন্য কতটা কঠিন। অথচ এই চায়ের দোকানের আয়েই চলে তার সংসার।
নিহালের জন্মের আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান বাবা সুলতান আহম্মেদ। মা খাদিজাতুন কুবরা একাই মানুষ করেছেন একমাত্র ছেলেকে। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই ছোটবেলা থেকেই। পড়াশোনার পাশাপাশি শ্রমিক, রাজমিস্ত্রির জোগালি, ইলেকট্রিশিয়ান— যা পেয়েছেন, করেছেন। পরে একটি টেক্সটাইল মিলে কাজ নেন।
বছর চারেক আগে ছুটিতে বাড়ি ফিরে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে গিয়েই ঘটে বিপদ। বিদ্যুৎ নেই ভেবে খুঁটিতে উঠে লাইনে হাত দিতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যান নিহাল। দুই হাত পুড়ে ঝলসে যায়। খুঁটিতে আটকে নিস্পন্দ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা ভেবেছিলেন মারা গেছেন। কিছুক্ষণ পর নড়াচড়া দেখে তাড়াতাড়ি নামিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হলে চিকিৎসকরা দুই হাতের কনুই পর্যন্ত কেটে ফেলতে বাধ্য হন।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান লাঞ্জু বললেন, 'এ পরিস্থিতিতে অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিতেন। কিন্তু নিহাল বেছে নিয়েছে সংগ্রামী জীবন।'
দুর্ঘটনার পর মা-ছেলে দুজনেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কিছুদিন মানুষের সহায়তায় চলেছেন। তারপর নিহাল ঠিক করলেন, বসে থাকবেন না। ২০২৩ সালে একটি মুদির দোকান দিলেন। কিন্তু সেই আয়ে সংসার চলে না। তাই পাশেই শুরু করলেন চা বিক্রি।
এখন সেই বটগাছতলার ছোট্ট দোকানে চা ছাড়াও আছে বিস্কুট, চানাচুর, বাদাম, মুড়ি, পান আর শিশুদের খাবার। বাজারে আসা মানুষ ও স্থানীয় তরুণ-যুবকরাই তার নিয়মিত ক্রেতা। প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা লাভ থাকে। এই দিয়েই চলে মা, স্ত্রী আর এক সন্তানের সংসার।
নিহালের ভাষ্য, 'হাত ছাড়া সব কাজে একটু সমস্যা হয়, কিন্তু মানিয়ে নিয়েছি। কোনোরকমে খেয়ে-না-খেয়ে চলছি। জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই।'
স্থানীয় বাসিন্দা শাকিল আহাম্মেদ, আজমল আলী খান ও আব্দুর রশিদ জানিয়েছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিহাল স্বাভাবিক মানুষের মতোই দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা তাকে একটি পাকা দোকানঘর ও প্রাথমিক মূলধন দিয়ে সহায়তা করলে তিনি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে পরিবার নিয়ে বাঁচতে পারবেন।
মাদারগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহালের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তার ব্যবসায় সহায়তার বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী জানালেন, 'তাকে কিছুটা সহায়তা করা হয়েছে। আর্থিক সাহায্যের আবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
প্রতিদিন ভোরে সেই বটগাছতলায় চুলা জ্বলে ওঠে। দুই কনুইয়ে ভর করে নিহাল বানিয়ে যান এক কাপ, দুই কাপ চা। হাত নেই, কিন্তু হার মানার ইচ্ছেও নেই।




