মেঘ-ঢেউয়ের প্রেমে মুগ্ধতা

আকাশজুড়ে ধূসর মেঘের চাদর। কখনো টুপটাপ, কখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। দূরে উত্তাল সমুদ্রের গর্জন, বাতাসে নোনা জলের গন্ধ। একের পর এক ঢেউ ছুটে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে সৈকতের বালুকাবেলা। বৃষ্টির ফোঁটায় ধুয়ে যাওয়া নির্মল সেই সৈকতে ছাতা হাতে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজেই হাঁটছেন পর্যটকরা। কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে খেলছেন, কেউ ক্যামেরাবন্দি করছেন প্রকৃতির অপার্থিব সৌন্দর্য। বর্ষার এই রূপে যেন নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার।
রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের ব্যস্ততা আর কোলাহলকে পেছনে ফেলে বর্ষার কক্সবাজার যেন একেবারেই অন্যরকম। আকাশের ধূসরতা আর সমুদ্রের নীল-সবুজ জল একাকার হয়ে তৈরি করেছে নান্দনিক এক ক্যানভাস। ঢেউয়ের গর্জন, বাতাসে উড়ে আসা বৃষ্টির কণা আর ভেজা বালুকাবেলার প্রতিটি পদচিহ্ন যেন বলে দিচ্ছে প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর শিল্পকর্মের নাম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত।
বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টি কোনোভাবেই আটকে রাখতে পারেনি পর্যটকদের। অনেকে ছাতা হাতে হাঁটছেন, আবার কেউ ইচ্ছে করেই বৃষ্টিতে ভিজছেন। শিশুদের উচ্ছ্বাস, তরুণ-তরুণীদের হাসি আর পরিবারগুলোর একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সৈকত।
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা সুমাইয়া আক্তারের চোখে বর্ষার কক্সবাজার এক অন্য অভিজ্ঞতা। তার ভাষায়, বৃষ্টির দিনে সমুদ্রের সৌন্দর্য একেবারেই অন্যরকম। আকাশ মেঘলা, চারপাশে বৃষ্টি আর সামনে বিশাল সমুদ্র। সব মিলিয়ে দারুণ লাগছে। বৃষ্টিতে ভিজে সমুদ্র দেখার অনুভূতি সত্যিই আলাদা।
চট্টগ্রাম থেকে আসা রাকিব হাসানও মুগ্ধ প্রকৃতির এই রূপে। তার ভাষ্য, অনেক দিন পর কক্সবাজারে এসেছি। এখানে এসে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রথমে একটু খারাপ লাগলেও পরে দেখলাম, বৃষ্টির মধ্যেই সমুদ্রের সৌন্দর্য আরও বেড়ে গেছে। তাই বৃষ্টিকে উপভোগ করতেই সৈকতে নেমেছি।
শুধু দূর-দূরান্তের পর্যটকরাই নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও বর্ষার এই রূপ উপভোগে কম যান না। কেউ ছাতা হাতে, কেউ আবার বৃষ্টিতে ভিজেই হাঁটছেন সৈকতজুড়ে। অনেকেই মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন ভেজা আকাশ, উত্তাল ঢেউ আর বৃষ্টিস্নাত সৈকতের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
স্থানীয় দর্শনার্থী মোহাম্মদ ইরফান বললেন, সমুদ্রের সৌন্দর্য সব ঋতুতেই আলাদা। বৃষ্টি, রোদ কিংবা শীত প্রতিটি সময়েরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। আমাদের সৌভাগ্য, সমুদ্রের শহরেই জন্ম আর বেড়ে ওঠা।
বর্ষার দিনে কক্সবাজার সমুদ্র যেন রং বদলায়। অনেক সময় ধূসর আকাশ আর সাগরের জল মিশে তৈরি করে বিষণ্ন অথচ মুগ্ধকর এক আবহ। দূরে জমে থাকা কালো মেঘ, তীরে আছড়ে পড়া সাদা ফেনার ঢেউ আর ভেজা বালুকাবেলায় মানুষের পায়ের ছাপ। সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির জীবন্ত জলরঙের ছবি।
তবে এই সৌন্দর্যের মাঝেও রয়েছে সতর্কতার প্রয়োজন। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে লাল পতাকা টাঙিয়ে বিপজ্জনক স্রোতের বিষয়ে সতর্ক করা হলেও অনেক পর্যটক তা উপেক্ষা করে গভীর পানিতে চলে যাচ্ছেন।
সৈকতে দায়িত্ব পালন করা সি সেইফ লাইফগার্ডের সিনিয়র সদস্য মোহাম্মদ ওসমান বলেছেন, কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে আমাদের সদস্যরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছেন। পর্যটকদের নিরাপদে রাখতেই আমরা সারাক্ষণ সতর্ক করছি। যাতে কেউ গভীর পানিতে গিয়ে দুর্ঘটনায় না পড়েন।
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, বর্ষাকালে কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কমলেও এই সময়ের আলাদা এক আকর্ষণ রয়েছে। যারা প্রকৃতির নীরবতা, বৃষ্টির স্নিগ্ধতা আর সমুদ্রের রুক্ষ সৌন্দর্য একসঙ্গে অনুভব করতে চান, তাদের কাছে বর্ষার কক্সবাজার এক অনন্য গন্তব্য।





