‘ঢাকা থেকে কত ছেলে ফেরে, আমার ছেলে আর ফেরে না’

ছবি: আগামীর সময়
‘ঢাকা থেকে কত ছেলে বাড়ি ফিরে আসে, কিন্তু আমার ছেলে আর ফিরবে না। ছেলেকে হারিয়ে আমার জীবন অন্ধকার হয়ে গেছে। আমি শুধু আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত মিরাজুল ইসলাম মিরাজের মা মোহছেনা বেগম। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ছেলেকে হারানোর শোক, বিচার না পাওয়ার বেদনা এবং সংসারের অনিশ্চয়তা আজও তাড়া করে ফিরছে পরিবারটিকে।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের সরদারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম মিরাজ (২১)। জীবিকার তাগিদে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে একটি দোকানে কাজ করতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জন করে অসুস্থ বাবা আব্দুস সালামের চিকিৎসা এবং ছোট দুই ভাই মেজবাউল ও সিরাজুলের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন। স্বপ্ন ছিল পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানার সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হন মিরাজ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ৮ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট একটি কুঁড়েঘরেই মানবেতর জীবন কাটছে পরিবারটির। ছেলে হারানোর শোক আজও কাটিয়ে উঠতে পারেননি মা মোহছেনা বেগম। আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
মায়ের ভাষ্য, ছেলে সব সময় পরিবারের কথা ভাবত। নিজের কষ্টের কথা না ভেবে বাবা-মা ও ভাইদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখত। এখন সেই স্বপ্নের সঙ্গে তাদের ভরসাটুকুও হারিয়ে গেছে।
ছেলের মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে কিছুদিন পর মারা যান বাবা আব্দুস সালাম। এরপর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে ছোট ভাই মেজবাউল মিয়ার কাঁধে। মাধ্যমিক পাস করার পরই তাকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামতে হয়েছে।
মেজবাউল মিয়া উল্লেখ করেন, তার ভাই দেশের জন্য আন্দোলনে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। তিনি হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ বিচার চান। শুরুতে অনেকেই পাশে থাকার আশ্বাস দিলেও এখন খুব কম মানুষই পরিবারের খোঁজ নেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, বিএনপি, জামায়াত, প্রশাসনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা মিললেও স্থায়ী পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে তারা মিরাজ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গুঞ্জন বিশ্বাস জানান, জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তাদের কোনো প্রয়োজন হলে জানালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানবিক সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পরও শহীদ মিরাজুল ইসলাম মিরাজের পরিবারের জীবনে শোকের ছায়া কাটেনি। বিচার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষায় এখনও দিন গুনছেন তার স্বজনরা।





