৫৭ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে উপস্থিত ৩ শিক্ষার্থী, শিক্ষকও ৩ জন

ছবি: আগামীর সময়
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ৫৪ নম্বর মল্লিকের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। বিদ্যালয়ের নথিতে শিক্ষার্থী ৫৭ জন থাকলেও গত সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীকে উপস্থিত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত সাতটি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন।
শিক্ষকসংকট, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশসহ নানা সমস্যায় বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের এসব সমস্যার কারণে গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী নদী পেরিয়ে পাশের চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে যাচ্ছে।
গত সোমবার সকাল নয়টা থেকে পৌনে ১২টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, সাতটি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন তিনজন। প্রধান শিক্ষকের পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে সহকারী শিক্ষক সবুজ চন্দ্র দাস ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। অন্য দুই শিক্ষক হলেন সামছুননাহার ও রেশমী আক্তার।
বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৭ জন। তবে গত সোমবার সকাল থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা বিদ্যালয়ে অবস্থান করেও মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীকে উপস্থিত পাওয়া যায়। তাদের পাঠদানের জন্যও পর্যাপ্ত শিক্ষক ছিলেন না।
বিদ্যালয়টির দ্বিতল ভবনে মোট চারটি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে একটি স্টোররুম ও একটি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাকি দুটি শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ছিল নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইমামপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মল্লিকের চর গ্রামে দুই হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। গ্রামটিতে ভোটারসংখ্যা সহস্রাধিক। তাদের দাবি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার বয়সী শতাধিক শিশু নদী পেরিয়ে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণেও বিদ্যালয়টির প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে গেছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে সন্তানদের নদী পেরিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল কাদের আল মারুফ বললেন, ‘তিন শিক্ষকের দায়িত্বে অবহেলা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি অমনোযোগিতার বিষয়টি জানিয়ে আমরা গ্রামবাসীর গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হবে।’
স্থানীয় একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে তাদের সন্তানদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে গ্রামের অধিকাংশ শিশু নদী পেরিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাবেন না বলেও তাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন।
তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি, তারা ‘ভিলেজ পলিটিক্সের’ শিকার। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সবুজ চন্দ্র দাস ও সহকারী শিক্ষক সামছুননাহার নতুন শিক্ষক যোগদানের শর্তে অন্যত্র বদলির অনুমতি নিয়ে রেখেছেন বলে তারা জানান। আরেক শিক্ষক রেশমী আক্তার আগামী অক্টোবর মাসে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গত সোমবার বিদ্যালয়ে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সবুজ চন্দ্র দাসকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে তিনি জানান, হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় ছুটিতে রয়েছেন। বিদ্যালয়ে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এবং শ্রেণিকক্ষের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কোনো উত্তর দেননি।
বিদ্যালয়ে ফেরদৌস মিয়া নামে একজন নৈশপ্রহরী কাম দপ্তরি ছিলেন। তবে তাকে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে গজারিয়া উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আলী আকবর বললেন, ‘সবুজ চন্দ্র দাসকে শ্রেণিকক্ষ নোংরা রাখাসহ বিভিন্ন কারণে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় কাজ করছে।’
স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত শিক্ষকসংকটের সমাধান, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নয়ন এবং নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা হলে মল্লিকের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে আবার শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাড়বে।





