সাভারে নীলা হত্যা মামলা
সাক্ষ্যগ্রহণের প্যাঁচে ছয় বছর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একদিকে প্রকাশ্যে ঘুরছেন মেয়ের হত্যা মামলার আসামিরা। অন্যদিকে একমাত্র মেয়েকে হারানোর শোক বুকে পাথর চাপা দিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন বাবা নারায়ণ রায়। সাভারের স্কুলছাত্রী নীলা রায় হত্যার ছয় বছর কেটে গেলেও শেষ হয়নি মামলার বিচার। সাক্ষ্যগ্রহণেই আটকে আছে মামলার কার্যক্রম; ১৮ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য হয়েছে মাত্র ৯ জনের।
‘মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না’— ছয় বছর পরও মেয়ের কথা বলতে গিয়ে এভাবেই আক্ষেপ করলেন নারায়ণ রায়। আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এখন মেয়ে হত্যার বিচার নিয়ে মাথা ঘামাই না। কারণ আমি নিরীহ মানুষ; তা ছাড়া তো আমার কোনো উপায়ও নেই।’
২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাতে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় সাভার পৌর এলাকার ব্যাংক কলোনির অ্যাসেড স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী নীলা রায়কে। হত্যার ছয় বছর পরও মামলার আসামিরা জামিনে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন তার বাবা। বলছিলেন, ‘আমার একমাত্র মেয়েকে হারিয়েছি। ছয় বছরেও বিচার পেলাম না। আমি শতভাগ নিশ্চিত, এই আসামিদের কিছুই হবে না। তারপরও আমি চাই, সুষ্ঠু বিচার হোক।’
নীলার নাচের প্রতি আগ্রহ ও বিভিন্ন পুরস্কার পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার মেয়ে নৃত্য করে অনেক পুরস্কার পেয়েছে। এজন্য এলাকার মানুষ সবাই তাকে চিনত, তাকে অনেক ভালোবাসত। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না। মেয়েকে খুন করে আসামিরা এখন জামিনে প্রকাশ্যে ঘুরছে। অথচ বিচার পেলাম না।’
যেভাবে হত্যা করা হয় নীলাকে: মামলার বিবরণ ও নথিপত্রে বলা হয়, ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাতে সাভারে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে নীলা রায় ও তার ভাই অলক রায়ের পথরোধ করেন আসামি মিজানুর রহমান চৌধুরী। পরে তার ভাইয়ের কাছ থেকে নীলাকে ছিনিয়ে পাশের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। সেখানে নীলাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যান মিজানুর। পরে নীলাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
ফেসবুকে মিজানুরের সঙ্গে পরিচয় নীলার। একপর্যায়ে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেন মিজানুর। তবে নীলা তাতে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যা করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে মামলার নথিতে।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় মামলা করেন নীলার বাবা নারায়ণ রায়। এতে মিজানুর রহমান চৌধুরীকে প্রধান করে মামলায় আসামি করা হয় মিজানুরের বাবা আবদুর রহমান ও মা নাজমুন্নাহার সিদ্দিকাকে।
অভিযোগপত্রে মিজানুর রহমান চৌধুরী, তার বন্ধু সাকিব হোসেন ও সেলিম পাহলানকে করা হয় আসামি। তবে মিজানুরের বাবা আব্দুর রহমান ও মা নাজমুন্নাহার সিদ্দিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের অব্যাহতির আবেদন করে পুলিশ। মামলায় অভিযোগ প্রমাণে সাক্ষী করা হয় ১৮ জনকে।
পরে ২৩ সেপ্টেম্বর সেলিম পাহলানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সাভারের উলাইল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় প্রধান আসামি মিজানুরকে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি।
পরদিন ২৬ সেপ্টেম্বর মিজানুরের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজিব হাসানের আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় আরেক আসামি সাকিব হোসেনকে। একই বছরের ২৮ এপ্রিল ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার থানার পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) নির্মল কুমার দাস। তবে এর পরেই বিভিন্ন সময়ে জামিন পান তিন আসামি।
২০২২ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক ইসমত জাহান আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন। মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়, ওই বছরের ৩১ অক্টোবর।
সাক্ষ্যগ্রহণেই আটকে বিচার: মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। গত ২৪ মে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। তবে ওইদিন আদালতে হাজির হননি কোনো সাক্ষী। পরে সাক্ষ্যগ্রহণ পিছিয়ে ধার্য করা হয়েছে আগামী ২৫ নভেম্বর দিন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে ৯ জনের সাক্ষ্য। গত বছরের ২২ মে সাক্ষ্য দেন নুর মোহাম্মদ ও হারুন নামে দুজন। এর পর থেকে আর কোনো সাক্ষ্য হয়নি।
মামলার তিন আসামির মধ্যে জামিনে রয়েছেন প্রধান আসামি মিজানুর রহমান ও সেলিম পাহলান। তবে গত ২৪ মে আদালতে হাজির না হওয়ায় আসামি সাকিব হোসেনের জামিন বাতিল করে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর জহিরুল ইসলাম জানালেন, ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে সমন পাঠিয়েও আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না অনেক সাক্ষীকে। তবে এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে ৯ জন পাবলিক সাক্ষীর সাক্ষ্য।
তার ভাষ্য, আগামী তারিখে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা ম্যাজিস্ট্রেট ও চিকিৎসককে সাক্ষ্যের জন্য সমন জারি করা হয়েছে। এই তিন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়ার মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে নেওয়া হবে পরবর্তী পদক্ষেপ। মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করতে খুব বেশি সময় লাগবে না প্রত্যাশা এই পাবলিক প্রসিকিউটর।



