পাবনায় বিজেসির সরকারি জমি দখলের মহোৎসব : নেপথ্যে প্রভাবশালীরা

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের পাটক্রয় কেন্দ্রের সরকারি জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং মূল্যবান যন্ত্রাংশ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন গড়ে উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চৌবাড়িয়া গ্রামের প্রায় পুরো পাটক্রয় কেন্দ্র এলাকা দখল করে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে অনেকেই ঘরে তালা লাগিয়ে সরে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে চলনবিলাঞ্চলের কৃষকদের সুবিধার্থে ভাঙ্গুড়া পৌর এলাকার চৌবাড়িয়া গ্রামে প্রায় সাড়ে তিন একর জমির ওপর মদনলাল আগরওয়ালা ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। স্বাধীনতার পর এটি ভাঙ্গুড়া পাটক্রয় কেন্দ্র নামে পরিচিতি পায়। এখান থেকে কৃষকদের পাট সংগ্রহ করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে পাঠানো হতো। পরে পাটকলগুলো বন্ধ হতে থাকলে কেন্দ্রটির কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর এলাকাটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে প্রভাবশালীরা ধীরে ধীরে জমি দখল করে এবং বিভিন্ন ব্যক্তি তা ক্রয়-বিক্রয়ও করেছেন। কয়েক দফা হাতবদল হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় জরিনা রহিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত আলী পাটক্রয় কেন্দ্র এলাকায় বসতি স্থাপনের কথা স্বীকার করেছেন। তবে কীভাবে সেখানে বসতি গড়েছেন জানতে চাইলে তিনি অসংলগ্ন কথা বলে ফোন কেটে দেন।
আরেক দখলদার পাশ্ববর্তী উপজেলার একটি কলেজের শিক্ষক মো. শামীম প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও পরে দাবি করেন, তিনি ২০১১ সাল থেকে ডিসি অফিসে ভাড়া দিয়ে আসছেন। তার ভাষ্য, পাকা স্থাপনার জন্য প্রতি স্কয়ার ফিটে ১৬ টাকা করে ভাড়া দেওয়া হয়। তবে লিজের কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তিনি।
এলাকার একটি আধাপাকা ভবনে মিফতাহুল ফালাহ প্রিক্যাডেট মাদ্রাসার কার্যক্রম চলছে। মাদ্রাসার মালিক গোলাম মোস্তফা প্রথমে পাঁচ লাখ টাকায় জায়গা নেওয়ার কথা উল্লেখ করলেও পরে তা অস্বীকার করে জানান, অন্য একজনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে অস্থায়ীভাবে ঘর তুলেছেন। তার ভাষ্য, আগে অন্যরা স্থাপনা করেছে বলেই তিনিও করেছেন।
পাটক্রয় কেন্দ্রের পাশেই ভাঙ্গুড়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ লিজ নেওয়ার দাবি করলেও কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
চৌবাড়িয়া গ্রামের প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. আব্দুল জলিল অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রের মূল্যবান যন্ত্রাংশ রাতের আঁধারে বিক্রি করা হয়েছে। তার ভাষ্য, জমি প্লট করে বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি এই জমি দখলমুক্ত করে কৃষকদের কল্যাণে ব্যবহারের দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে জুট কর্পোরেশনের চুক্তিভুক্ত ভাড়াটিয়া বিএম গোলজার হোসেন উল্লেখ করেছেন, তিনি ২০২৩ সালে প্রথমে এক বছরের জন্য ২ দশমিক ১৯ একর জমি ইজারা নেন, যা পরে ২০২৭ সাল পর্যন্ত নবায়ন হয়েছে। তার দাবি, তিনি জমিতে খামার করেছেন এবং যন্ত্রাংশ বিক্রির কোনো ক্ষমতা বা কার্যক্রম তার নেই। তবে ভাড়া দেওয়ার অনুমতি আছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভাড়াকৃত সম্পত্তি অন্যের কাছে হস্তান্তর বা ভাড়া দেওয়ার সুযোগ নেই জানানো হলে তিনি এ বিষয়ে আর মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ভাঙ্গুড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, জমিটি পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং গোলজার হোসেন বৈধভাবে ইজারা নিয়েছেন। তবে ইজারার বাইরে অবৈধ দখল ও পাকা স্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মাকছিম উল্লেখ করেছেন, মোট সাড়ে তিন একর জমির মধ্যে ২ দশমিক ১৯ একর ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাকি জমি বিভিন্নভাবে দখল হয়েছে বলে তারা জেনেছেন। দখলমুক্ত করতে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।




