নারায়ণগঞ্জে ৬ মাসে ৬৬ খুন
- ১০ বার পুলিশ-র্যাবের ওপর হামলা, বেড়েছে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নারায়ণগঞ্জে একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে উদ্বেগ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত জেলায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৬৬টি। একই সময়ে পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১০টি। বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক কারবার ও গণপিটুনির ঘটনাও। ফলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা যেমন বাড়ছে, তেমনি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা দিচ্ছে উদ্বেগজনকভাবে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ৫৪টি হত্যাকাণ্ড, ২৩টি ডাকাতি, ৪২টি দস্যুতা, ১২৮টি চুরি, ৯টি অপহরণ এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১০৯টি। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধী চক্র এখন ড্রোন, সিসি ক্যামেরা ও মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি নজরদারি করছে, যা অভিযান পরিচালনাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
গত ছয় মাসে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৪০টি আলোচিত ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, মাদক, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, পূর্বশত্রুতা এবং গণপিটুনির মতো নানা কারণ উঠে এসেছে।
জুলাই মাসেই সিদ্ধিরগঞ্জে মারধরের শিকার এক বৃদ্ধ, আড়াইহাজারে জমি নিয়ে সংঘর্ষে আহত এক যুবক এবং ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হয় এক অটোরিকশাচালকের। একই সময়ে বন্দর ও ফতুল্লায় হাত বাঁধা ঝুলন্ত মরদেহ, নিখোঁজ অটোরিকশাচালকের মরদেহ এবং বিকাশ ব্যবসায়ীকে হত্যার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এপ্রিল ও মার্চে শিশু হত্যা, একাধিক অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার, পূর্বশত্রুতার জেরে কুপিয়ে হত্যা, ছিনতাইয়ের সময় গণপিটুনিতে মৃত্যু, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বছরের শুরুতেও সহিংসতার ধারা ছিল অব্যাহত। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ড্রাম ও পুকুর থেকে ভাসমান মরদেহ উদ্ধার, ছুরিকাঘাত, কুপিয়ে হত্যা, নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার এবং কারামুক্তির ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এক যুবক নিহত হওয়ার মতো একাধিক ঘটনা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে, অপরাধীদের বেপরোয়া মনোভাবের আরেকটি দিক হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা। গত ছয় মাসে আসামি গ্রেপ্তার, মাদকবিরোধী অভিযান কিংবা নিয়মিত দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যদের ওপর হামলা করা হয়েছে অন্তত ১০টি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন একাধিক পুলিশ সদস্য। ঘটেছে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও। কয়েকটি ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার আসামিকেও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে পুলিশের কাছ থেকে।
পরিস্থিতিকে আরও বিব্রতকর করেছে বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ। অভিযানের নামে স্বর্ণালংকার চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুই পুলিশ সদস্যকে। এ ছাড়া অপহরণের অভিযোগে ঢাকা জেলা ডিবির চার সদস্যকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে আনা হয়েছে আইনের আওতায়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতির কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদীর ভাষায়, ঘনবসতি, পারিবারিক বিরোধ, মাদক কারবার এবং অন্য জেলা থেকে মরদেহ এনে ফেলে যাওয়ার মতো কারণে বেড়েছে হত্যার সংখ্যা। তার মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে মব সন্ত্রাসও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। একই সঙ্গে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুমের ভাষ্য, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা মানুষের নিরাপত্তাবোধ আরও দুর্বল করে।’




