তবুও থামছে না বালু উত্তোলন

ড্রেজার বসিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। ছবি: আগামীর সময়
দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। এই প্রকল্পের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ২৭ দশমিক ২ কিলোমিটার মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড। এই সড়কটি জাতীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করবে বন্দরকে।
প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা। এটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয় দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য। কিন্তু উন্নয়নের এই মহাযজ্ঞকে ঘিরেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মহেশখালীর উপকূল ও চ্যানেল এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন।
অভিযোগ রয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া ও পরিবেশবিধি লঙ্ঘন করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। এ নিয়ে এরইমধ্যে জনস্বার্তে রিট করা হয়েছে হাইকোর্টে। অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনও।
গত ১৫ জুন রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহানা শারমিন।
রিট আবেদন সূত্রে জানা গেছে, মহেশখালীর উপকূল ও চ্যানেল এলাকা থেকে প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে প্রকল্পটির জন্য। সরকারি হিসাবে প্রতি ঘনফুট বালুর রয়্যালটি মূল্য ৬ টাকা ৯৪ পয়সা হলেও ড্রেজিং ব্যয়ের সমন্বয়ের যুক্তিতে কার্যকর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা।
আইনজীবী সোহানা শারমিনের অভিযোগ, এ মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টোকিও-ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমআইএল) জেভিকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ আর্থিক সুবিধা। এতে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
জেলা প্রশাসনের গঠিত উপকমিটির নথি অনুযায়ী, প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ১৬ টাকা ৭০ পয়সা এবং গণপূর্ত বিভাগ ১৬ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এমনকি রয়্যালটি হিসাবেও মূল্য ধরা হয়েছিল ৬ টাকা ৯৪ পয়সা। কিন্তু এসব সুপারিশ উপেক্ষা করে চূড়ান্তভাবে মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২ টাকা ৩৭ পয়সা। ফলে এত কম মূল্য নির্ধারণের আইনি ভিত্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
সরকারি হিসাবে অনুমোদিত ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালুর বিপরীতে ৬ টাকা ৯৪ পয়সা হারে রাজস্ব আদায় হলে সরকারের আয় হওয়ার কথা প্রায় ৪৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু বর্তমান হারে রাজস্ব আসবে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রথম ধাপেই সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৯ কোটি টাকা।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পুরো প্রকল্পে প্রকৃত বালুর চাহিদা হতে পারে ২০ থেকে ৩৩ কোটি ঘনফুটের বেশি। সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে যেতে পারে ২১৩ কোটি টাকা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, একই পদ্ধতিতে ভবিষ্যতে আরও বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে ক্ষতির পরিমাণ অতিক্রম করতে পারে ৪৫০ কোটি টাকাও।
রিটে আরও বলা হয়েছে, বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী সরকারি প্রকল্পে বালু সরবরাহ বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ প্রকল্পে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে উঠেছে অভিযোগ।
রিটকারীর মতে, এটি শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতিরও পরিপন্থী।
বিতর্কের আরেকটি বড় বিষয় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) ছাড়াই বালু উত্তোলনের অনুমতি। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মহেশখালী চ্যানেল, হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা উপকূলীয় এলাকা থেকে এ পরিমাণ বালু উত্তোলনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ধরনের ড্রেজিং বা বালু উত্তোলন আইনসম্মত নয়।’
তবে অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট মতামত উপেক্ষা করেই। এমনকি পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে প্রয়োজনীয় আবেদনও করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে জেলা প্রশাসনের অনুমতিপত্রে শর্ত ছিল ১৮ ইঞ্চি কাটার ড্রেজার ব্যবহারের। কিন্তু সরেজমিনে প্রমাণ পাওয়া গেছে ১২ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার ব্যবহারের। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিদর্শন দলও নিশ্চিত করেছে বিষয়টি।
বিআইডব্লিউটিএ কক্সবাজার কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াকিল আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সাকশন ড্রেজার সমুদ্রতলে গভীর গর্ত সৃষ্টি করে উপকূলীয় ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এতে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন, ভাঙন বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।’
ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী এম. ইব্রাহিম খলিল মামুনের মতে, ‘বর্তমান হারে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে মহেশখালী চ্যানেল ও আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চল মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ঝুঁকিতে রয়েছে ঠাকুরতলা উপকূল, হামিদারদিয়া চরাঞ্চল, সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন, আদিনাথ মন্দিরসংলগ্ন মৈনাক পাহাড় এবং কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারিত রানওয়ে এলাকা।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রতলের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হলে উপকূল ক্ষয়, জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে জীববৈচিত্র্যের।
বিতর্কিত বালু উত্তোলনের বিষয়টি এরইমধ্যে নজরে এসেছে দুদকের। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করে অনুসন্ধান শুরু করেছেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. নাছরুল্লাহ হোসাইন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া পরিচালিত বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে আইনি নোটিস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে। এ বিষয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে মহেশখালী প্রেসক্লাব, ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি, কক্সবাজার সিভিল সোসাইটি ও নদী পরিব্রাজক দলও।
রিটকারী আইনজীবী সোহানা শারমিন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও অপচয় প্রতিরোধ করা রাষ্ট্র এবং নাগরিকের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু এ প্রকল্পে আইন উপেক্ষা করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।’
সামাজিক সংগঠন আমরা কক্সবাজারবাসীর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আগামীর সময়কে বলেছেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। তবে পরিবেশবিধি লঙ্ঘন, প্রশাসনিক অনিয়ম ও রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগে প্রকল্পটি প্রশ্নবিদ্ধ হলে উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন ও সামনে চলে আসে জবাবদিহির বিষয়টিও।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘হাইকোর্টে রিট, দুদকের অনুসন্ধান এবং পরিবেশবাদীদের আপত্তির পরও মহেশখালী উপকূলে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। ফলে এখন আদালতের সিদ্ধান্ত, দুদকের অনুসন্ধান এবং সরকারের পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছেন উপকূলের মানুষ।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান এবং প্রকল্প পরিচালক আকবর হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।






