ঐতিহ্য হারিয়ে শুধু নিরবে দাঁড়িয়ে আছে আমতলীর টাউন হল

আমতলী পৌর শহরের ঐতিহ্যবাহী টাউন হল
বরগুনার আমতলী পৌর শহরের ঐতিহ্যবাহী টাউন হলটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে ভবনটির টিনের চালা উড়ে যাওয়ার পর আর সংস্কার করা হয়নি। অথচ উপজেলা শহরে সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বড় কোনো সামাজিক আয়োজনের জন্য আধুনিক কোনো অডিটরিয়ামও নেই। ফলে টাউন হলটি দ্রুত সংস্কার করে জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকর্মীরা।
স্থানীয়দের কাছে টাউন হলটি শুধু একটি ভবন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমতলীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় এ ভবনকে ঘিরেই নাটকের মহড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মকাণ্ড চলত।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের মে মাসে তৎকালীন সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি থানায় একটি করে অডিটরিয়াম নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে আমতলীকে অন্তর্ভুক্ত করেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মাদ নিজাম উদ্দিন আহমেদ তালুকদার। জায়গা নির্ধারণ ও অর্থ বরাদ্দের পর ওই বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিলেন স্বাধীনতার পর আমতলী থানার প্রথম বেসরকারি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম পাশা তালুকদার। অডিটরিয়ামটির নাম দেওয়া হয় ‘আমতলী টাউন হল’। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মাদ নিজাম উদ্দিন আহমেদ তালুকদারের পরামর্শে বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন গাজী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আতাহার উদ্দিন আকন টাউন হলটির নকশা করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পর ১৯৭৭ সালের দিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মাদ শাহ আলম তালুকদারের উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে চাঁদা তুলে সেখানে একটি ব্যায়ামাগার চালু করা হয়। কিছুদিন কার্যক্রম চলার পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৮৬ সালে উপজেলা পরিষদ টাউন হলটি সংস্কারের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। তবে পরে সেখানে সিনেমা হল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য বরগুনার শ্যামলী সিনেমা হলের মালিক জুলফিকার শাহিনের সঙ্গে উপজেলা পরিষদ চুক্তি করে। এর প্রতিবাদে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। পরে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম তালুকদারের সময়ে সেখানে ‘সুরভি সিনেমা হল’ চালু হয়।
দীর্ঘদিন সিনেমা হলটি চালু থাকলেও ব্যবসায়িকভাবে সফল না হওয়ায় একপর্যায়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। উপজেলা পরিষদের ভাড়াও বকেয়া পড়ে। পরে হলদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মাহবুব উল আলম ঝুন্টু তালুকদারের পরামর্শে সাংবাদিক বাহাদুর খানসহ স্থানীয় তরুণরা উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে টাউন হলের মঞ্চসহ কিছু অংশ সংস্কার করেন। তখন সেখানে উদীচী, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও একতা ক্লাবের উদ্যোগে নাটকের মহড়া ও মঞ্চায়ন হতো।
এরপর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে গলাচিপার আব্দুল আলিমের মালিকানায় ভবনটি আবার লাভলু সিনেমা হল নামে চালু হয়। ২০০৪ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান তালুকদারের নির্দেশে সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে যায়। এর তিন বছর পর সিডরের আঘাতে ভবনটির টিনের চালা উড়ে যায়। এরপর থেকে ভবনটি আর সংস্কার না হওয়ায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
মানবাধিকারকর্মী আব্দুর রহমান সালেহ বলেছেন, আমতলীর ঐতিহ্যবাহী টাউন হলটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। সরকারি উদ্যোগে এটি সংস্কার ও মেরামত করা হলে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, টাউন হলটি কীভাবে সুন্দর, নান্দনিক ও জনগণের ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। টাউন হলটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনে নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর ঐতিহ্য ও নান্দনিকতা সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।




