রাতে উত্তাল পদ্মায় ৫ ফুট ঢেউ, একাধিক নৌকাডুবি

ছবি: আগামীর সময়
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত তখন প্রায় ৯টা। দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে নদীপাড়ের মানুষ যখন ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বদলে গেল পদ্মার চেহারা। শান্ত নদী মুহূর্তেই যেন উত্তাল হয়ে উঠল। একের পর এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকল তীরে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল প্রায় ৫ থেকে ৬ ফুট। অন্ধকার রাতে এমন ভয়াবহ ঢেউ দেখে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। কেউ ছুটেছেন ঘরবাড়ি রক্ষায়। কেউ আবার নদীতে থাকা নৌকা উদ্ধারে।
নৌকাগুলো শুধু নদীতে চলাচলের বাহন নয়। অনেক পরিবারের কাছে এগুলোই জীবিকা। মাছ ধরা, যাত্রী পারাপার কিংবা নদী থেকে নানা কাজে ব্যবহার- নৌকাকে ঘিরেই চলে অনেক পরিবারের সংসার। সেই নৌকা ঢেউয়ের মুখে পড়ে ডুবে যেতে দেখে স্বজনদের মধ্যে শুরু হয় ছোটাছুটি।
বুধবার রাতে এমন পরিস্থিতিতে নৌকা রক্ষায় গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন একাধিক মাঝি ও তাদের স্বজনেরা। স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে বেশ কয়েকটি নৌকা ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় অন্তত ৫ থেকে ৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরে তাদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কেশবপুর এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা বলছেন, পদ্মার এমন রূপ তাদের কাছে অভূতপূর্ব। তাদের দাবি, গত ৩০ বছরের মধ্যে এমন ভয়াবহ ঢেউ ও উত্তাল পরিস্থিতি তারা দেখেননি।
হঠাৎ নদীর এমন আচরণে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারা। বিশেষ করে যাঁদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা নদীর কাছাকাছি, তাদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। রাতের অন্ধকারে নদীর গর্জন আর তীরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দে অনেকেই ঘর থেকে বের হয়ে পরিস্থিতি দেখতে বাধ্য হন।
নদীপাড়ের মানুষের ভয় শুধু নৌকা ডুবে যাওয়া কিংবা আহত হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের বড় উদ্বেগ নদীভাঙন নিয়ে। পদ্মার পানি ও ঢেউয়ের চাপ বাড়লে তীরবর্তী বাঁধ ও বসতভিটা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তীর রক্ষায় নির্মিত বাঁধের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। কোথাও কোথাও বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উত্তাল পদ্মার ঢেউ সেই শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী বলছেন, শুধু সাময়িক সংস্কার নয়, নদীভাঙন থেকে ঘরবাড়ি ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় টেকসই নদী তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। তারা দ্রুত বাঁধ সংস্কার ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি কার্যকর নদী তীর সংরক্ষণে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
পদ্মার সঙ্গে রাজশাহীর মানুষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। এই নদী কখনো জীবিকার উৎস, কখনো সৌন্দর্যের প্রতীক। আবার কখনো সেই নদীই হয়ে ওঠে আতঙ্কের কারণ। বুধবার রাতের উত্তাল পদ্মা সেই পুরোনো আশঙ্কাকেই যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
দিনের আলোয় যে নদীকে শান্ত মনে হয়, রাতের অন্ধকারে সেই নদীর এমন ভয়ংকর রূপ দেখে কেশবপুরের মানুষ এখন অপেক্ষায়- কখন থামবে ঢেউ, কখন স্বাভাবিক হবে পদ্মা, আর কখন নিরাপদ হবে তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেছেন, সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে জরুরি সতর্কতা হিসেবে টি-বাঁধ এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কাউকে প্রবেশ বা জড়ো না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় যেখানে পদ্মার পাড়ে মানুষের ভিড় জমে, সেখানে এখন নীরবতা। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি নগর রক্ষা বাঁধের স্থিতিশীলতাও পর্যবেক্ষণ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
আরিফুর রহমান অঙ্কুর বললেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি শহর রক্ষা বাঁধ ও নদীতীরবর্তী অন্যান্য অবকাঠামোর পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে জেলেদের সাবধানে চলাচল এবং তাদের মাছ ধরার নৌকা সাবধানে রাখতে বলা হয়েছে।




