সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে খামার, চলছে বালু উত্তোলন

চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখল করে চলছে মাটি উত্তোলন। ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। সেখানে বনভূমি দখল, অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনসহ অভিযোগ উঠেছে পরিবেশ ধ্বংসের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের নথি, বিভিন্ন মামলা এবং সরকারি দপ্তরে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে মুরগির খামার, ফলের বাগানসহ নির্মাণ করছে বিভিন্ন স্থাপনা। একই সঙ্গে স্কেভেটর ও ড্রেজার ব্যবহার করে বনের ভেতর ও আশপাশ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে বালি ও মাটি।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন স্থানীয় বশির ড্রাইভারের ছেলে মোহাম্মদ আলী লিটন। তার বিরুদ্ধে একাধিক বন মামলা, ফৌজদারি মামলাসহ লিখিত অভিযোগ রয়েছে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খুটাখালী ইউনিয়নের নরপাড়ি, গোদারপাড়ি, হরিখোলা ও কচুতলিয়া এলাকার সংরক্ষিত বনভূমির বিস্তীর্ণ অংশ দখল করা হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছ কেটে জমি সমতল করে সেখানে মুরগির খামার, ফলের বাগানসহ গড়ে তোলা হয়েছে অন্যান্য স্থাপনা। এতে বন উজাড়ের পাশাপাশি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ।
এ ছাড়া অভিযোগ আছে খুটাখালী ছড়া, খাল ও বসতভিটার আশপাশে দিনরাত ড্রেজার ও স্কেভেটর দিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের। এতে বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
আগামীর সময়ের প্রতিবেদকের হাতে আসা বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একাধিক বন মামলা হয়েছে মোহাম্মদ আলী লিটন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। হরিখোলা এলাকায় সংরক্ষিত বনে অবৈধ প্রবেশ, বনভূমির আকৃতি পরিবর্তন, বালি উত্তোলন ও মাটি পাচারের অভিযোগে আসামি করা হয়েছে মোহাম্মদ আলী লিটন (৩৫) ও তার ভাই মো. ইব্রাহিমকে (৩২)। গোদারপাড়ি এলাকায় বনভূমি পরিষ্কার করে দখল, মাটি কেটে জমি সমতল করা এবং মুরগির খামার নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। একইভাবে আরেকটি মামলায় আসামি করা হয়েছে বনের জমি সমতল করে চাষাবাদের অভিযোগে মোহাম্মদ আলী লিটন, মো. ইব্রাহিম ও ইকবালকে।
কচুতলিয়া এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছ কেটে ফলের বাগান তৈরির মাধ্যমে বনভূমি দখলের অভিযোগে মামলা আছে মোহাম্মদ আলী লিটন ও জালাল ড্রাইভারের বিরুদ্ধেও।
শুধু বন আইনের মামলাই নয়, গত ২৩ জুলাই চকরিয়া থানায় করা একটি মামলায় মোহাম্মদ আলী লিটনসহ ৮ থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। মামলায় বলা হয়েছে, জঙ্গল খুটাখালী মৌজার দখল করা বরই বাগানসংলগ্ন এলাকায় প্রবেশকে কেন্দ্র করে এক আইনজীবীর পরিবারের সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলা, একটি বাছুর কুপিয়ে হত্যাসহ দেওয়া হয় প্রাণনাশের হুমকি।
গত ২৪ জুলাই খুটাখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া স্মারকলিপিতে অভিযোগ করেন, মোহাম্মদ আলী লিটনের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি চক্র ড্রেজার ও স্কেভেটর ব্যবহার করে বসতভিটা ও খতিয়ানভুক্ত জমি থেকে জোরপূর্বক বালি ও মাটি উত্তোলন করছে।
নথিপত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চকরিয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ারুল করিম একটি মামলা নিয়েছেন।
ভুক্তভোগী আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইয়াসমিন আক্তার হ্যাপী জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসছেন আলী লিটন ও তার সহযোগীরা। বনভূমি দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি তার মহিষের পাল ওই এলাকায় গেলে একটি বাছুর কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং আরেকটি মহিষ নিখোঁজ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
গত ১৬ জুলাই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে দেওয়া এলাকাবাসীর এক লিখিত আবেদনে বলা হয়, খুটাখালী মৌজার বন বিভাগের ২ নম্বর খতিয়ানের আরএস ৬১ ও বিএস ৭০ দাগের আওতাধীন প্রায় ১৫ একর সরকারি বনভূমি দীর্ঘদিন ধরে ঘন সালবন ও স্থানীয় কৃষকদের গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। সম্প্রতি বন বিভাগের অনুমতি ছাড়াই সালগাছ কেটে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ফলের বাগান তৈরি করে সরকারি বনভূমি দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আলী লিটন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘আমি বন দখল, বালি উত্তোলন কিংবা কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। একটি মহল আমাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেছেন, ‘লিটনের আমরা একাধিক মামলা করেছি। মামলা করার পর পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া আদালতের বিষয়।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম জানান, বন বিভাগের নথি, মামলা এবং এলাকাবাসীর ধারাবাহিক অভিযোগ থেকে স্পষ্ট, খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখলসহ ঝুঁকি বাড়ছে পরিবেশ ধ্বংসের।
তার মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে বনভূমি দখলমুক্ত করা, অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধ করা এবং জড়িত ব্যক্তি বা সহযোগী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় এনে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় দ্রুত সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।





