বাঁধ জলাবদ্ধতা যন্ত্রণা
- এক দশকেও হয়নি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা
- ডেঙ্গুঝুঁকিতে মাওয়া প্রান্তের শত শত পরিবার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পদ্মা সেতু বদলে দিয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। বদল এসেছে মাওয়া প্রান্তের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রাতেও; কিন্তু সেতুর একেবারে পাশেই যেন উল্টো ছবি। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে মাওয়া প্রান্তের বিভিন্ন এলাকা। দীর্ঘদিন জমে থাকা নোংরা পানিতে বাড়ছে মশার উপদ্রব। ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন শত শত পরিবার। এমন চিত্র মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার। স্থানীয়দের অভিযোগ, এক দশক ধরে এই দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে দেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন প্রকল্পের পাশে তৈরি হয়েছে ‘আলোর নিচে অন্ধকারের’ মতো পরিস্থিতি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুমে তাদের দুর্ভোগ বেড়ে যায় সবচেয়ে বেশি। টানা বৃষ্টি হলে অনেক বাড়ির উঠান ও চলাচলের পথ ডুবে যায় পানিতে। কোথাও কোথাও হাঁটুপানি জমে থাকে দিনের পর দিন। এতে শিশুদের স্কুলে যাতায়াত, বয়স্কদের চলাচল এবং ব্যাহত হয় দৈনন্দিন কাজ। জমে থাকা পানিতে পচা আবর্জনা মিশে ছড়ায় দুর্গন্ধ। বাধ্য হয়ে ঘরের প্রবেশপথে ইট, বালু ও মাটি ফেলে চলাচলের ব্যবস্থা করেন অনেকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে নদীশাসনের কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর। ওই সময় প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় নির্মাণ করা হয় স্থায়ী বাঁধ। তবে বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা রাখা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে বৃষ্টির পানি বের হতে না পেরে দীর্ঘদিন জমে থাকে বিভিন্ন স্থানে।
জলাবদ্ধ এলাকার বাসিন্দা সেলিম ও সাবিনা বললেন, ‘ঘরের চারপাশের পানি শুকায় না। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। মশার উপদ্রব এত বেশি যে দিনের বেলাতেও মশারি টানিয়ে রাখতে হয়।’
সাত বছর বয়সী ফাতেমা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ। তার বাড়ির আশপাশেও জমে আছে নোংরা পানি। স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাবদ্ধতার কারণে মশার প্রজনন বেড়েছে। আরেক ভুক্তভোগী আবুল হোসেন বললেন, ‘উন্নয়নের জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে পুনর্বাসিত হয়েছি। ভেবেছিলাম নতুন জীবন পাব; কিন্তু এখন পানি, মশা আর রোগের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।’
ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন শেফালি বেগম— বললেন, ‘সমস্যা নিয়ে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি।’ দ্রুত পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা চান তারা।
তাদের আরও দাবি, শুধু মশা নিধনের ওষুধ ছিটিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং পানি চলাচলের স্থায়ী পথ তৈরি করতে হবে। তা না হলে প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতার সঙ্গে রোগের ঝুঁকিও ফিরে আসবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হুমায়ুন রাজিব জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন জমে থাকা পানি মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ তৈরি করে। এতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জলাবদ্ধতা দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু বলেছেন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও মশার উপদ্রব কমাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্থায়ী সমাধানের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পদ্মা সেতু দেশের উন্নয়নের প্রতীক; কিন্তু তার পাশের মানুষের বছরের পর বছর জলাবদ্ধতায় আটকে থাকা যেন সেই উন্নয়নেরই এক বেমানান ছবি। স্থানীয়দের দাবি, এবার প্রতিশ্রুতি নয়, পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী সমাধান চান তারা।






