বড়পুকুরিয়া ঘিরে নতুন স্বপ্ন

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের চৌহাটী গ্রাম। একসময় এই জনপদ ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। অথচ এই মাটির গভীরে লুকিয়ে ছিল দেশের অন্যতম মূল্যবান খনিজ সম্পদ— কয়লা। সেই সম্পদকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি, পরে প্রতিষ্ঠিত হয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ দুটি স্থাপনা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, পরিণত হয়েছে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিবর্তনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে।
বড়পুকুরিয়া শুধু একটি কয়লা খনির নাম নয়; এটি কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক উন্নয়নের সম্ভাবনার প্রতীক। আর সেই সম্ভাবনাকেই আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছেন পার্বতীপুরের মানুষ।
খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে ৫২৫ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে বিদ্যুৎ। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড়পুকুরিয়ার এই অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। খনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পরিবহন, আবাসন, খাবারের হোটেল, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং নানা সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। হামিদপুর ইউনিয়নসহ পার্বতীপুরের আশপাশের বাজারগুলোয় বেড়েছে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড।
দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের অভাবে পার্বতীপুরের অনেক তরুণকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর কিংবা বিদেশে পাড়ি দিতে হয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, খনি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে পরিকল্পিত শিল্পায়ন হলে এই প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। খনি পরিচালনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি সেবা, পরিবহন ও আধুনিক শিল্প ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা গেলে উন্মোচিত হবে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত।
বড়পুকুরিয়া উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি সোলায়মান সামীর মনে করেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে বড়পুকুরিয়াকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক ‘মাইনিং সিটি’ গড়ে তোলা সম্ভব। যেখানে থাকবে উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, মানসম্মত সড়ক যোগাযোগ, পরিকল্পিত আবাসন ও নাগরিক সুবিধা। তার মতে, খনিজসম্পদের পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা। কারণ, একটি শিল্পাঞ্চলের বিকাশ শুধু একটি কারখানা বা খনির ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পুরো অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, বড়পুকুরিয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সহজ শর্তে ঋণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে উত্তরাঞ্চলের নতুন শিল্পবেল্ট হিসেবে পার্বতীপুর আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এতে স্থানীয় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রাংশ ও সেবা খাতেও সৃষ্টি হবে নতুন সম্ভাবনা।
তবে উন্নয়নের এই যাত্রাপথকে টেকসই করতে হলে পরিবেশগত ভারসাম্য ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, উন্নয়ন ও পরিবেশ— দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েই বড় শিল্প প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, খনি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো ক্ষয়ক্ষতি বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। যেখানে প্রয়োজন সেখানে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমও হবে অধিকতর টেকসই।
বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে দিনাজপুর জেলা প্রশাসন নতুন করে তদন্ত ও সমীক্ষা পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়ার পর শুরু হবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যক্রম। এতে উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।




