সিলেটের রেল যোগাযোগ
অবহেলা আর ভোগান্তির যাত্রা

২৯ বছর আগের কথা। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাত। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া গ্যাসকূপে বিস্ফোরণ ঘটে। যেটি ‘মাগুরছড়া ট্র্যাজেডি’ হিসেবে পরিচিত। সে সময় সারা দেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল ১৬৩ দিন। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন চলাচল করত শ্রীমঙ্গল পর্যন্ত। সিলেটের যাত্রীরা শ্রীমঙ্গল পর্যন্ত এসে বাসে চড়ে দুই ঘণ্টায় সিলেট আসতেন। একইভাবে সিলেট থেকে বাসে শ্রীমঙ্গলে গিয়ে ঢাকা বা চট্টগ্রামের ট্রেনে চড়তেন। এ থেকেই বোঝা যায়, সিলেটের মানুষ রেলপথের যাত্রায় কতটা আগ্রহী।
সিলেট অঞ্চলের মানুষ এখনো রেলপথে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কিন্তু অহরহ দুর্ঘটনা, রেলযাত্রায় ভোগান্তি, শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে এ অঞ্চলের মানুষ ক্ষুব্ধ। গত বছরও সিলেট বিভাগের মানুষ রেলপথের সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করেছেন। বিশেষ করে সিলেট-ঢাকা কিংবা সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে আখাউড়া পর্যন্ত ১৭৮ কিলোমিটারে ভোগান্তি বেশি। ট্রেনের গতি কম, সেবাও নিম্নমানের। জরাজীর্ণ বগি ও নাজুক রেললাইনের কারণে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। সিলেট-আখাউড়া ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন স্থাপন, সিলেট-ঢাকা বিরতিহীন ট্রেন চালু, সিলেটে রেলওয়ের আলাদা প্রশাসনিক বিভাগ চালু করার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু বছরের পর বছর আশ্বাসই বিশ্বাস করে আসছেন এই অঞ্চলের মানুষ। রেলপথের কোনো উন্নয়ন হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন চালুর উদ্যোগ নেন; কিন্তু সফল হননি। যদিও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সিলেট-ঢাকা রুটে ‘বুলেট ট্রেন’ চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার আমলে এসবের কিছুই হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরনো রেললাইন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু, জরাজীর্ণ ইঞ্জিনের কারণে সিলেট-ঢাকা এবং সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও ভোগান্তি। একের পর এক লাইনচ্যুতি, ইঞ্জিন বিকল ও যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। পর্যটননির্ভর এই অঞ্চলের মানুষ বলছেন, প্রতিদিনই ট্রেনে যাতায়াত করতে হচ্ছে অনিশ্চয়তা নিয়ে।
সবশেষ ঈদুল আজহার পরদিন গত ২৯ মে বিকালে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে তেলবাহী একটি ট্রেনের ওয়াগন লাইনচ্যুত হওয়ায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ ছিল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়া অসংখ্য যাত্রী।
এর আগে ১৩ মে দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী এলাকায় সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেসের একটি বগিতে আগুন লাগে। এতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের ৭ অক্টোবর একটি ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে আসার পথে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার এলাকায় ইঞ্জিনসহ চারটি বগি লাইনচ্যুত হলে আহত হন ২০ যাত্রী। এ সময় সারা দেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে ৩ ঘণ্টা।
এর আগে মার্চ ও এপ্রিলে সিলেট-আখাউড়া রুটে একাধিক দুর্ঘটনা ও ট্রেনে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা ঘটে। ২৬ মার্চ ভৈরব বাজার জংশনে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হলে সিলেটের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত হয়। ৩১ মার্চ মৌলভীবাজারের ভানুগাছ-শমশেরনগর এলাকায় উপবন এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ১ এপ্রিল কুমিল্লায় উদয়ন এক্সপ্রেসের তিনটি বগি ইঞ্জিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ২ এপ্রিল হবিগঞ্জের মাধবপুরে তেলবাহী ট্রেনের পাঁচটি ওয়াগন লাইনচ্যুত হলে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে যোগাযোগ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সিলেট রুটে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৯ সালের ২৩ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বরমচাল এলাকায়। ওই দুর্ঘটনায় তিন নারীসহ পাঁচজন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন। একটি কালভার্ট ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ট্রেনের ১০টি বগি। একটি বগি ছিটকে পড়ে বড়ছড়া খালে। দুটি বগি উল্টে পড়ে পাশের জমিতে। বাকি সাতটি ছিটকে পড়ে রেললাইনের পাশে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সিলেট রুটে প্রতিদিন আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে ছয়টি। এর মধ্যে চারটি সিলেট-ঢাকা এবং দুটি সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করছে। এ ছাড়া চলাচল করে কয়েকটি লোকাল ও পণ্যবাহী ট্রেন। আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে প্রতিদিন যাতায়াত করেন কয়েক হাজার যাত্রী। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি; বরং আগে যে সুবিধা ছিল, সেগুলো কমানো হয়েছে। আগে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে তিনটি করে এসি কেবিন কোচ ছিল। বর্তমানে আছে একটি। এ ছাড়া সিলেট স্টেশনে অতিরিক্ত কোনো কেবিন কোচ না থাকায় বিদ্যমান একটি কোচ বিকল হলে এসি কোচ সংযোজন করা সম্ভব হয় না।
সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রেললাইন খুবই জরাজীর্ণ। অনেক স্থানে ট্র্যাক ও স্লিপার দুর্বল হয়ে পড়েছে। ছোট-বড় ২৫০টি সেতুর মধ্যে বেশিরভাগই ৬০-৭০ বছর আগে নির্মিত।
রেলওয়ে সূত্রমতে, এই রুটে অন্তত ১৩টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এর মধ্যে সিলেট থেকে মোগলাবাজার রেলস্টেশন পর্যন্ত মাত্র ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে আটটি, আর আখাউড়া পর্যন্ত রয়েছে আরও পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ সেতু। এসব সেতু পারাপারের সময় ট্রেন চলাচল করতে হয় ৫ কিলোমিটার গতিতে।
এসব সেতু অনেক পুরনো, কাঠের স্লিপারের অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের ক্লিপ ও হুক উঠে গেছে। দীর্ঘদিনেও সেতুগুলো সংস্কার না করায় প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ঝুঁকি নিয়ে রেলপথে যাতায়াত করেন।
তবে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম জানালেন, নিয়মিত রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে সংস্কার কাজও চলছে, তবে সীমাবদ্ধতাও আছে।
দ্রুত সিলেট রেলওয়ে স্টেশনকে বিভাগ (ডিভিশন) করার দাবি স্থানীয়দের। তারা মনে করেন, এখানে বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হলে বিভাগীয় প্রকৌশলীসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদের ব্যক্তি থাকবেন, নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি হবে। এখন ট্রেনের নতুন বগি এলে দেখা যায় ঢাকা বা চট্টগ্রামে বরাদ্দ দেওয়ার পর অবশিষ্ট থাকলে সিলেটের ভাগ্যে জোটে; নতুবা বঞ্চিতই থাকতে হয়।
রেল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরনো অবকাঠামো দিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন। দ্রুত ডাবল লাইন নির্মাণ, আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু এবং নতুন ইঞ্জিন সংযোজন না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
সিলেট ভ্রমণে আসা পর্যটক আহসান রাফি বললেন, ‘সিলেট খুব সুন্দর জায়গা; কিন্তু ট্রেন যাত্রার অভিজ্ঞতা বেশ কষ্টকর। সময়মতো ট্রেন না আসা, ভেতরের পুরনো কোচ ও মাঝপথে দেরি, সব মিলিয়ে ভ্রমণটা ক্লান্তিকর হয়ে গেছে। যদি ট্রেনসেবা আরও আধুনিক এবং সময়নিষ্ঠ হতো, তাহলে সিলেট ভ্রমণ আরও আরামদায়ক হতো।’
সিলেট বিভাগ গণদাবি ফোরামের সভাপতি চৌধুরী আতাউর রহমান আজাদের মতে, ‘সিলেটের রেলপথ সীমাহীন উপেক্ষার শিকার। এটি সিলেটবাসীর প্রতি বঞ্চনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।’ তিনি অবিলম্বে সিলেটে রেলওয়ের ডিভিশন প্রতিষ্ঠা, সিলেট-ঢাকা রুটে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন স্থাপন এবং সিলেট-ঢাকা বিরতিহীন স্পেশাল ট্রেন চালুর দাবি জানান।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি খন্দকার শিপার আহমদ প্রায় একই সুরে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেছেন, সিলেটের রেল যোগাযোগের উন্নয়ন হলে পর্যটনসহ দেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক হবে। সিলেট-ঢাকা পথে অন্তত একটি ট্রেন থাকা দরকার, যাতে সকালে ঢাকা গিয়ে বিকালে সিলেট ফেরা যায়। এ ছাড়া সিলেট-কক্সবাজার ও সিলেট-ময়মনসিংহ রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালু সময়ের দাবি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আশার কথা, ২ মে সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিলেটের রেল যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
আর ২৪ মে সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘আখাউড়া-সিলেট রেললাইন ডাবলগেজ করার ব্যাপারে মন্ত্রিসভার সবশেষ বৈঠকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।’




