৪৭তম বিসিএস
হারিকেনের আলো থেকে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম তানভীর

তানভীর রহমান-ছবি: সংগৃহীত
একসময় সন্ধ্যা নামলেই বাড়িতে জ্বলে উঠত হারিকেন। ছিল না বিদ্যুৎ। স্কুল ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন যাওয়া-আসা হতো পায়ে হেঁটেই। অভাব-অনটনে কাটিয়ে ছিল জীবন। সেই সাধারণ জীবন পেরিয়ে বিসিএসের পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম। বিসিএসে প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েই এই কৃতিত্ব অর্জন। বলছিলাম নেত্রকোনার তানভীর রহমানের কথা।
গতকাল রবিবার প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হন তানভীর। তার এই সাফল্যে নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রাম আনন্দিত। গর্বিত পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীও।
তানভীর রহমান নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমানের ছেলে। তার বাবা মো. আব্দুর রহমান নেত্রকোনার শামছুদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মা গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় তানভীর।
ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা আব্দুর রহমান। বললেন, ‘রেজাল্টের খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। আমার আর চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। যা চেয়েছি তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি।’
‘ছোটবেলা থেকেই তানভীর পড়াশোনায় খুব মনোযোগী ছিল। শুধু লেখাপড়াই নয়, খেলা-ধুলাতেও সমান আগ্রহ ছিল তার। গ্রামের বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন হেঁটেই স্কুলে যেত। তখন এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। অনেক রাত পর্যন্ত হারিকেন কিংবা মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করেছে। পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও কখনো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি।’—যোগ করেন তিনি।
মা রিনা পারভীন ছেলের এই অর্জনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বললেন, ‘আমাদের ছিল একটি ছোট টিনসেড ঘর। এতগুলো মানুষের সেই ছোট ঘরে থাকা, খাওয়া আর পড়াশোনা করা ছিল খুবই কষ্টের। কিন্তু আমার ছেলে কখনো হাল ছাড়েনি। ছোটবেলা থেকেই সে আড্ডা বা অকারণে ঘোরাঘুরিতে সময় নষ্ট করেনি। এখনো বাড়িতে এলে বেশিরভাগ সময় আমার সঙ্গেই কাটায়। তানভীরের নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা আর কঠোর পরিশ্রমই তাকে আজ এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।’
তানভীরের শিক্ষাজীবনও সাফল্যে ভরপুর। ২০১৯ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৫ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছেন তানভীর। প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়ার এই সাফল্য অনেকের কাছে বিস্ময়কর। তবে পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, এটি কোনো আকস্মিক অর্জন নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি।
তানভীরের ছোটবোন সাদিয়া জানালেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ভাই খুব নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করতেন। নিজের লক্ষ্য নিয়ে সব সময় সচেতন ছিলেন। তাই তার এই সাফল্যে পরিবারের কেউ বিস্মিত নন, বরং গর্বিত।’
এলাকাবাসীর কাছেও তানভীর এখন অনুপ্রেরণার নাম। তাদের ভাষ্য, একজন সাধারণ শিক্ষক বাবার সন্তান হয়েও দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এমন সাফল্য অর্জনে তারা বিস্মিত। স্বপ্ন পূরণে অর্থ নয়, প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দেশের পররাষ্ট্র সেবায় দায়িত্ব পালন করে তানভীর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবেন। একই সঙ্গে তার এই অর্জন নেত্রকোনার নতুন প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগাবে।
হারিকেনের আলোয় শুরু হওয়া যে পথচলা, আজ তা পৌঁছেছে দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনের সর্বোচ্চ স্বীকৃতির একটিতে। তানভীর রহমানের গল্প শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; এটি প্রত্যন্ত গ্রামের হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার প্রতীক। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিষ্ঠা, অধ্যবসায় আর সঠিক লক্ষ্য থাকলে যে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়, তানভীর রহমান তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।






